
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি কেবল একটি পদ বা ক্ষমতার অধিকারী নন; তিনি সমাজের অভিভাবক, ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থল এবং জনকল্যাণের অন্যতম দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তাই একজন সৎ ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রতিনিধি যেমন জনগণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র হন, তেমনি দুর্নীতিগ্রস্ত ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন ঘৃণার প্রতীক। বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে দুই ধরনের জনপ্রতিনিধির অস্তিত্ব দেখা যায়। একদল আছেন, যারা জনগণের আস্থা ও ভালোবাসাকে সম্মান করেন। তারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনসেবাকে ইবাদত মনে করেন। জনগণের সুখ-দুঃখে পাশে থাকেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকেন এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা সুষ্ঠুভাবে বণ্টনের চেষ্টা করেন। তাদের কাছে জনপ্রতিনিধিত্ব কোনো ব্যবসা নয়; বরং এটি একটি আমানত। অন্যদিকে, কিছু ব্যক্তি জনগণের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে রাজনীতিকে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। নির্বাচনের সময় জনগণের দ্বারে দ্বারে গিয়ে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়ালেও ক্ষমতায় গিয়ে তারা জনস্বার্থ ভুলে যান। দুর্নীতি, অনিয়ম, টেন্ডারবাজি, ত্রাণ আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি কিংবা চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত এমন অনেক কথিত জনপ্রতিনিধি সমাজে বিভাজন ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেন। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ তো দূরের কথা, বরং সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও জটিল করে তোলেন। দেশে বয়ে যাওয়া করোনা মহামারির সময় আমরা দেখেছি, সংকটকালেই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় মেলে। কেউ কেউ নিজের সামর্থ্য ও সরকারি সহায়তা নিয়ে অসহায় মানুষের ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছেন, সান্ত্বনার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আবার কিছু ব্যক্তি জনগণের জন্য বরাদ্দ খাদ্যসামগ্রী আত্মসাৎ করে সমালোচিত হয়েছেন।
ইতিহাস সাক্ষী, সংকটের সময় জনগণ কখনোই প্রকৃত সেবকদের ভুলে যায় না; আবার বিশ্বাসভঙ্গকারীদেরও ক্ষমা করে না। আমাদের সমাজে এমন অনেক জনপ্রতিনিধির দৃষ্টান্ত রয়েছে, যারা কয়েক দশক ধরে জনগণের আস্থা ধরে রেখেছেন। তারা কখনো ভোট কেনার রাজনীতি করেননি; বরং সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তাদের মৃত্যুতে সাধারণ মানুষ স্বজন হারানোর মতো শোকাহত হয়। কারণ তারা ক্ষমতার জোরে নয়, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের শক্তিতে নেতা হয়েছেন।
ক্ষমতা নিঃসন্দেহে আল্লাহর এক বড় নিয়ামত। কিন্তু এই ক্ষমতা যেমন মানুষকে সম্মানিত করতে পারে, তেমনি অপব্যবহারের কারণে অপমানিতও করতে পারে। ইতিহাস বলে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। পদ ও প্রভাব একদিন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। তাই জনপ্রতিনিধিদের মনে রাখা উচিত— জনগণের দেওয়া দায়িত্ব একটি আমানত, যার হিসাব শুধু জনগণের কাছেই নয়, মহান আল্লাহর কাছেও দিতে হবে। জনগণ একজন জনপ্রতিনিধির কাছে খুব বেশি কিছু চায় না। তারা চায় সততা, সুষম উন্নয়ন, সঠিক বিচার, জুলুমের প্রতিকার এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধার নিশ্চয়তা। রাস্তা-ঘাট, কালভার্ট, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব। সরকারি অর্থ জনগণের সম্পদ; এটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। তাই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যুগে জনগণ অনেক বেশি সচেতন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকার কারণে দুর্নীতি বা অনিয়ম দীর্ঘদিন গোপন রাখা সম্ভব নয়। তাই জনপ্রতিনিধিদের উচিত দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা এবং মানবিকতা দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করা। ভোটাররা কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভোটকেন্দ্রে যান শুধু একটি আশায়– তাদের ভোটে নির্বাচিত ব্যক্তি তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হবেন। সেই প্রত্যাশার মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি জনপ্রতিনিধির নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে নেতৃত্ব হবে সেবা ও ত্যাগের প্রতীক; ক্ষমতা হবে জনকল্যাণের হাতিয়ার; আর জনপ্রতিনিধিত্ব হবে জনগণের আস্থা ও ভালোবাসার পবিত্র আমানত।
লেখক-
শিব্বির আহমদ রানা
(সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
ই-মেইল: shibbirahmedctg1990@gmail.com