শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন দুর্গোৎসব উদযাপনে শীলকূপের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শীলকূপ ইউনিয়নে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন বাঁশখালীতে পারিবারিক কলহে বিদ্যুতের খুঁটিতে যুবক, ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় উদ্ধার বাঁশখালীতে সাত্ত্বিক পূজা নির্বাচন কমিটি গঠন বায়তুল ইরফান আদর্শ মাদরাসায় বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতি ও নৈতিক চরিত্র গঠনে আলোচনা সভা সাত দিন পর দেশে ফিরল বিমানে মারা যাওয়া বাঁশখালীর প্রবাসী জসিমের মরদেহ বাঁশখালীর ৮৮ পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় সমন্বিত উদ্যোগ, পুলিশের মতবিনিময় সভা শীলকূপ ইউনিয়নে দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন করতে চেয়ারম্যান রাশেদ নূরীর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ মা ইলিশ রক্ষায় বাঁশখালীতে নৈশ অভিযান: ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা জরিমানা বাঁশখালীতে ১৫ বছর ধরে দখলে থাকা বনভূমি উদ্ধার

পহেলা বৈশাখ: উৎসবের আবরণে সংস্কৃতির নিঃশব্দ পরিবর্তন

  • প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২৫৩ বার পড়া হয়েছে

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতির প্রাণের উৎসব। এটি কেবল একটি দিন নয়, বরং হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, গ্রামীণ জীবনধারা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক অনন্য সমন্বয়। কৃষিভিত্তিক সমাজে নতুন বছরের সূচনা মানেই ছিল নতুন আশার আলো, নতুন হিসাবের খাতা, নতুন সম্পর্কের বন্ধন। কিন্তু সময়ের প্রবাহে এই উৎসবের রূপ ও বৈশিষ্ট্যে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। একালের পহেলা বৈশাখ আর সেকালের পহেলা বৈশাখের মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ঐতিহাসিকভাবে পহেলা বৈশাখের সূচনা মুঘল আমলে সম্রাট আকবরের শাসনামলেই। কৃষকদের খাজনা আদায় সহজ করতে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। সেই সময় থেকে নববর্ষ ছিল মূলত অর্থনৈতিক ও কৃষিভিত্তিক উৎসব। গ্রামবাংলার হাট-বাজারে বসত বৈশাখী মেলা, জমিদাররা আয়োজন করতেন ‘হালখাতা’, যেখানে পুরনো দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন হিসাব খোলা হতো, মিষ্টিমুখ করা হতো। এই অনুষ্ঠানগুলো ছিল সামাজিক সম্প্রীতি ও আন্তরিকতার প্রতীক।

গ্রামীণ পহেলা বৈশাখের মূল আকর্ষণ ছিল বৈশাখী মেলা। মেলায় পাওয়া যেত মাটির তৈরি খেলনা ও নানা শিল্পকর্ম, বাঁশের সামগ্রী, লোকজ হস্তশিল্প, নাগরদোলা, সার্কাস, পুতুল নাচ, বায়োস্কোপ—যা গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক সবাই এই মেলায় অংশ নিত স্বতঃস্ফূর্তভাবে। গ্রামীণ সংস্কৃতির এই চিরায়ত রূপ ছিল প্রাণবন্ত, সরল এবং হৃদয়গ্রাহী। একই সঙ্গে পহেলা বৈশাখ ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির দিন। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে এই উৎসব পালন করত। পান্তা-ইলিশ, পিঠা-পুলি, নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং লোকগানের মাধ্যমে ফুটে উঠত বাঙালির নিজস্বতা।
তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের অনেক দিক আজ বদলে গেছে। নগরায়ন, প্রযুক্তির বিস্তার এবং ভোক্তাবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে পহেলা বৈশাখ এখন অনেকাংশে বাণিজ্যিক উৎসবে রূপ নিয়েছে। শহরকেন্দ্রিক আয়োজনে দেখা যায় বিশাল মঞ্চ, ব্যান্ড সংগীত, কর্পোরেট স্পন্সরশিপ—যা অনেক সময় ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতিকে আড়াল করে দেয়।

বর্তমানে পহেলা বৈশাখ মানেই অনেকের কাছে ফ্যাশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি পোস্ট করা এবং বিনোদনকেন্দ্রিক আয়োজন। লাল-সাদা পোশাক, মুখোশ, রঙিন শোভাযাত্রা—এসব অবশ্যই উৎসবের অংশ, তবে এগুলোর মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সরলতা এবং মৌলিকতা। বিশেষ করে বৈশাখী মেলার ঐতিহ্য অনেক জায়গায় এখন আর আগের মতো নেই; যেগুলো আছে, সেগুলোও অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক বিনোদনের চাপে নিজেদের স্বকীয়তা হারাচ্ছে। এখনকার মেলায়, মেলার আড়ালে বসে জুয়ার আসর। নানা জুয়ার আসরে মেলার সেই চিরায়ত সৌন্দর্য মলিন হচ্ছে। একালের পহেলা বৈশাখে নিরাপত্তা, ভিড় এবং আনুষ্ঠানিকতার চাপও বেড়েছে। আগে যেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করত, এখন অনেক আয়োজনই নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ। গ্রামে-গঞ্জে এখনও কিছু জায়গায় পুরনো ঐতিহ্য টিকে থাকলেও তা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো খাদ্য সংস্কৃতিতে। আগে যেখানে ঘরে তৈরি পান্তা, শাক-সবজি, দেশি মাছ এবং পিঠা-পুলির আধিক্য ছিল, এখন সেখানে রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতি জায়গা করে নিয়েছে। পান্তা-ইলিশ আজ অনেক ক্ষেত্রে প্রতীকী বা বিলাসবহুল খাবারে পরিণত হয়েছে, যা সবার নাগালের মধ্যে নেই। অনেকটাই দুঃস্বপ্ন।

এই পরিবর্তনের পেছনে একদিকে যেমন আধুনিকতার প্রভাব রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে সচেতনতার অভাব। আমরা অনেকেই জানি না পহেলা বৈশাখের প্রকৃত ইতিহাস ও তাৎপর্য। ফলে উৎসবটি ধীরে ধীরে বাহ্যিক আড়ম্বরের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, আর অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, এখনও অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সচেতন মানুষ পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। লোকসংগীত, গ্রামীণ খেলাধুলা, হস্তশিল্প মেলা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজনের মাধ্যমে তারা নতুন প্রজন্মকে এই সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করানোর চেষ্টা করছেন। পহেলা বৈশাখকে তার প্রকৃত রূপে ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গ্রামীণ সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিতে হবে, স্থানীয় শিল্পীদের উৎসাহিত করতে হবে এবং বাণিজ্যিকতার প্রভাব কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পহেলা বৈশাখের ইতিহাস ও গুরুত্ব তুলে ধরা জরুরি, যাতে নতুন প্রজন্ম এই উৎসবের মর্মবাণী বুঝতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পহেলা বৈশাখের মূল চেতনা—সম্প্রীতি, ঐক্য এবং নতুন সূচনার বার্তা ধরে রাখা। এই উৎসবের মাধ্যমে আমরা যদি ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারি, তাহলেই এর প্রকৃত সার্থকতা অর্জিত হবে। অতএব, পহেলা বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয়; এটি আমাদের পরিচয়, আমাদের শিকড়। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেও আমাদের উচিত এই শিকড়কে অক্ষুণ্ণ রাখা। নইলে একসময় আমরা হয়তো বাহ্যিক উৎসবটুকু ধরে রাখব, কিন্তু হারিয়ে ফেলব তার আত্মা—যা বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি। পহেলা বৈশাখে অতীতের সেই জীবন্ত সংস্কৃতি, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, অতিথিপরায়ণতা ফিরে আসুক।

লেখক-
শিব্বির আহমেদ রানা
(গণমাধ্যমকর্মী ও কলাম লেখক)
বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
ই-মেইল: shibbirahmedctg1990@gmail.com

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews