বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৫২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
শীলকূপে পুকুরে বিষপ্রয়োগের অভিযোগ, ৫ লাখ টাকার মাছ নিধন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ বিদায়ী বক্তব্যে কাঁদলেন মির্জা ফখরুল, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে চাইলেন দলীয় এমপিদের ভোট সরকারের ১৮০ দিনের কর্মযজ্ঞের সমর্থনে বাঁশখালীতে যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দল-ছাত্রদলের মিছিল বাঁশখালীতে জাতীয় মৎস্য পক্ষের সমাপনী, টেকসই উৎপাদনে গুরুত্বারোপ বাঁশখালীর স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নাজমা আকতার পেলেন উপসচিবের পদ বাঁশখালীতে অবৈধ বালু উত্তোলন: ড্রেজারসহ ৩ জন আটক ফ্যামিলি কার্ড শুমারি: বাঁশখালীতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে দায়িত্বশীলতা ও সতর্কতার আহ্বান বাঁশখালীর সন্তান সাংবাদিক জিহাদ নুর চৌধুরী ‘আমরা জুলাইযোদ্ধা’র ঢাকা জেলার আহ্বায়ক

ওষুধ বিপণনে সংস্কার জরুরি, অপমান নয় জবাবদিহি চাই

  • প্রকাশিত: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ১৫৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়ন, ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে ওষুধ বিপণন পদ্ধতির দিকে নতুন করে তাকানো জরুরি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ফার্মাসিউটিক্যালস বিপণন কাঠামোর নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—বিশেষত চিকিৎসকদের ওপর প্রভাব বিস্তার, অস্বচ্ছ প্রণোদনা এবং অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের অভিযোগ। এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা কখনোই এমনভাবে প্রয়োগ করা উচিত নয়, যাতে নিরীহ ও পরিশ্রমী কর্মজীবী মানুষ অপমানিত হন বা অন্যায় আচরণের শিকার হন।সম্প্রতি রাজধানীর একটি শীর্ষ সরকারি হাসপাতালে কিছু মেডিকেল প্রোমোশন অফিসার বা বিক্রয় প্রতিনিধিকে যেভাবে আটক করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তা আমাদের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি সত্যিই সমস্যার মূল উৎসে আঘাত করছি, নাকি সহজ লক্ষ্যবস্তু বেছে নিচ্ছি?

মেডিকেল প্রোমোশন অফিসাররা স্বাস্থ্যখাতের একটি বাস্তব ও স্বীকৃত অংশ। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো চিকিৎসকদের কাছে নতুন ওষুধ, গবেষণালব্ধ তথ্য, ডোজিং গাইডলাইন এবং পণ্যের আপডেট পৌঁছে দিতে এই প্রতিনিধিদের নিয়োগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বহু দেশে এই পেশা নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হয়। সেখানে কঠোর নৈতিক নির্দেশনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন গাইডলাইন কার্যকর রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, World Health Organization (WHO) ওষুধের নৈতিক বিপণন বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—প্রচার কার্যক্রম হতে হবে তথ্যভিত্তিক, বৈজ্ঞানিক এবং বিভ্রান্তিমুক্ত। একইভাবে International Federation of Pharmaceutical Manufacturers & Associations (IFPMA) একটি বৈশ্বিক কোড অব প্র্যাকটিস চালু করেছে, যা ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিপণন আচরণে নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এসব নীতিতে কোথাও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের অপমান বা হয়রানির কোনো স্থান নেই; বরং পুরো ব্যবস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশেও এই বাস্তবতা ভিন্ন নয়। অধিকাংশ মেডিকেল প্রোমোশন অফিসার শিক্ষিত তরুণ, যারা কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের কাজ শুধু পণ্য বিক্রি নয়; বরং তথ্য সরবরাহ, চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং বাজার বাস্তবতা বোঝার মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন তৈরি করা। কিন্তু যখন কোনো নীতিগত সমস্যা দেখা দেয়, তখন সেই দায় সরাসরি তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একধরনের অবিচার।
প্রশ্ন হচ্ছে—সমস্যার মূল কোথায়? বাস্তবতা হলো, বিপণন কৌশল নির্ধারণ করে কোম্পানির উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা ও মালিকপক্ষ। টার্গেট নির্ধারণ, প্রণোদনা কাঠামো, প্রচারণার ধরন—সবই আসে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে। ফলে কোনো অনৈতিক বা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া থাকলে তার দায়ও মূলত সেখানেই বর্তায়। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কেবল সেই কাঠামোর বাস্তবায়নকারী। তাদেরকে বিচ্ছিন্নভাবে দায়ী করা সমস্যার সমাধান নয়; বরং প্রকৃত দায়ীদের আড়াল করার একটি উপায় হয়ে দাঁড়ায়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত ও ন্যায়ভিত্তিক সংস্কার উদ্যোগ। প্রথমত, ওষুধ বিপণনের ক্ষেত্রে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করা জরুরি, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এতে স্বচ্ছতা, তথ্যভিত্তিক প্রচারণা এবং চিকিৎসকদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোম্পানিগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন এবং তার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, চিকিৎসক, কোম্পানি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে একটি সমন্বিত জবাবদিহি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সংবেদনশীলতা ও মানবিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রকাশ্য অপমান, হয়রানি বা প্রদর্শনমূলক অভিযান কেবল ব্যক্তির মর্যাদাহানি ঘটায় না; বরং পুরো ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কোম্পানিগুলোর ভূমিকা। তাদের উচিত নিজেদের কর্মীদের শুধু বিক্রয়যন্ত্র হিসেবে না দেখে মানবিক ও পেশাগত মর্যাদাসম্পন্ন অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা। কর্মীদের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং নৈতিক কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা কোম্পানির দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। বিপদের সময়ে কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি সুস্থ করপোরেট সংস্কৃতিরও অংশ। সবশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে—স্বাস্থ্যখাত কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক ক্ষেত্র নয়; এটি মানুষের জীবন ও সুস্থতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এখানে প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে দায়িত্বশীল, মানবিক এবং ন্যায়ভিত্তিক। সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই সংস্কার হতে হবে কাঠামোগত, প্রমাণভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক।
নিরপরাধ কর্মীদের অপমান করে নয়, বরং প্রকৃত সমস্যার মূলে আঘাত করেই একটি ন্যায়সঙ্গত ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এখন সময় এসেছে সেই বাস্তবতা স্বীকার করে এগিয়ে যাওয়ার—সংস্কার হোক, তবে তা যেন হয় ন্যায়বিচার, সম্মান এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে।

লেখক-
শিব্বির আহমদ রানা
(গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট)
বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
ই-মেইল: shibbirahmedctg1990@gmail.com

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews