
শিব্বির আহমদ রানা::: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ডেঙ্গুজ্বরজনিত হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রিতা সোলতানা (২১) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। স্বজন ও স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, অসুস্থ অবস্থায় ওই গৃহবধূ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিবর্তে একজন পল্লিচিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ করা হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসার ধরন, রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নিহত গৃহবধূ বাঁশখালী উপজেলার বৈলছড়ি ইউনিয়নের অভ্যারখীল এলাকার বাসিন্দা। তাঁর ছয় মাস বয়সী একটি দুগ্ধপোষ্য সন্তান রয়েছে। মায়ের মৃত্যুতে শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পরিবারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে জ্বর ও শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন ওই গৃহবধূ। এ সময় তিনি সরল ইউনিয়নের খালাইচ্ছার দোকান এলাকার পল্লিচিকিৎসক মো. জমির উদ্দিনের কাছ থেকে চিকিৎসা নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে বাঁশখালী আধুনিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
স্থানীয়দের দাবি, ওই গৃহবধূ ডেঙ্গুজনিত জটিলতায়, বিশেষ করে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ এবং চিকিৎসা নিতে কোনো অবহেলা বা ভুল ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথি ও কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অভিযুক্ত পল্লিচিকিৎসক মো. জমির উদ্দিনের বিরুদ্ধে আগেও অপচিকিৎসার অভিযোগ ওঠার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মিনজিরিতলা জনৈক কুলসুমা খাতুন এর টিউমার এর অপারেশন ফলে তার অঙ্গহানির অভিযোগের প্রেক্ষিতে পল্লী চিকিৎসক জমির উদ্দিনের চেম্বারে অভিযান করা হয়। ওই অভিযোগের পর তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মাহমুদুল হাসান অভিযান চালান। সে সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাঁকে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।
ঘটনাটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মুমিনুল হক। নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘কলম একটা থাকলেই সব কিছু লেখা যায় না। যে রোগের ‘র’ ও বুঝেননা সেগুলো নিয়ে পাকনামি করার দরকার নেই। এভাবে অপচিকিৎসাতে অনেক মানুষের ক্ষতি হচ্ছে দিনদিন।’ পোস্টে তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, প্রেসক্রিপশনের সেইম ব্যক্তি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অপকর্ম করে কেমনে পার পেয়ে যাচ্ছেন সেটা দেখার বিষয়।’
এ বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী বলেন, ‘বৈলছড়িতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ছয় মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুর মায়ের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক। ডেঙ্গু জ্বর এবং এর ফলে সৃষ্ট হেপাটাইটিসসহ অন্যান্য অঙ্গের জটিলতা জীবনঘাতী হতে পারে। এ ধরনের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত জ্ঞান, দক্ষতা এবং যথাযথ চিকিৎসাব্যবস্থা জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন অননুমোদিত বা অযোগ্য ব্যক্তির পক্ষে ডেঙ্গুর মতো জটিল রোগের যথাযথ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত যোগ্যতা ও নির্ধারিত সীমা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগের শাস্তির প্রসঙ্গ তুলে ডা. প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, প্রায় তিন বছর আগেও তাঁর বিরুদ্ধে অপচিকিৎসার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। শাস্তির পরও যদি কেউ একই ধরনের অনিয়মে জড়িত থাকেন, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. জমির উদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, ‘জ্বরের জন্য আমি এক দিনের ওষুধ দিয়েছি। তাঁর ডেঙ্গু হয়েছিল কি না, তা আমি জানি না।’ তবে প্রেসক্রিপশনে সাত দিনের ওষুধ লেখা থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এ ধরনের রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সুস্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি।
ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, গৃহবধূর চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রেসক্রিপশন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন, চিকিৎসা নথি এবং পূর্বের ভ্রাম্যমাণ আদালতের আদেশ যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা কিংবা আইনগত যোগ্যতা ছাড়া চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
একই সঙ্গে জ্বর ও ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে নিজের উদ্যোগে ওষুধ সেবন কিংবা অযোগ্য ব্যক্তির কাছ থেকে চিকিৎসা না নিয়ে নিবন্ধিত চিকিৎসক ও অনুমোদিত স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
একটি শিশুর মাতৃহারা হওয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, চিকিৎসাসেবায় কোনো অনিয়ম ছিল কি না তা যাচাই এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন সচেতন মহল।