
শিব্বির আহমদ রানা::: সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা। ঘরবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমির পাশাপাশি হাজার হাজার নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন উপজেলার প্রায় ৩ লাখ মানুষ। এর ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বেড়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) তথ্য অনুযায়ী, বাঁশখালী উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে বন্যার কারণে মোট ৮ হাজার ২৬টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫২৩টি সম্পূর্ণ এবং ৩ হাজার ৫০৩টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া ২ হাজার ৪২৭টি টয়লেটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যার পানিতে নলকূপের মুখ তলিয়ে যাওয়ায় এবং দূষিত পানি প্রবেশ করায় অনেক নলকূপ এখনো ব্যবহার অনুপযোগী।কোথাও কোথাও ঘোলা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি উঠছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে নিরাপদ পানীয় জল সংগ্রহ করছে। স্থানীয়রা আরও বলেন, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি মোটরচালিত নলকূপ থেকে সীমিত পরিসরে পানি সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও সেগুলো সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হলেই বিশুদ্ধ পানির সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করছে এবং চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যায় আমাদের সরল ইউনিয়নের পূর্ব সরল ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ছলিয়াবাপের বাড়ি-সংলগ্ন নলকূপটি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। এখনও সেখান থেকে কোনো পানি উঠছে না। এ নলকূপের ওপর প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি পরিবার নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে তারা প্রায় ৪০০ ফুট দূরের একটি বাড়ি থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার পর দূষিত নলকূপ দ্রুত জীবাণুমুক্ত করা, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ মেরামত এবং সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়া নলকূপ পুনঃস্থাপন না করা হলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
বাঁশখালী উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সঞ্জিত চন্দ্র সরকার বলেন, ‘সাম্প্রতিক বন্যায় দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা থাকায় প্রাথমিক জরিপে উপজেলার ৮ হাজারের বেশি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। মাঠপর্যায়ে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই চলমান রয়েছে। জনবল সংকটের কারণে সঠিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহে কিছুটা সময় লাগছে। ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপগুলো পর্যায়ক্রমে মেরামত ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ কাজে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যাতে দুর্গত মানুষ নিরাপদ পানীয় জল পেতে পারেন।’
চট্টগ্রাম জেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস জানান, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ পুনঃস্থাপন, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ মেরামত এবং দুর্গত মানুষের জন্য নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বন্যার পর পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদ্যোগে জরুরি মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব ক্যাম্পে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।