
শিব্বির আহমদ রানা::: চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল ইউনিয়নের পূর্ব চাম্বলে একসময় ছিল দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো ঐতিহ্যবাহী গোলাম গৌজের হাট, যা স্থানীয়দের কাছে ‘গোলাম গজার হাট’ নামেই অধিক পরিচিত। সময়ের প্রবাহে বহু আগেই হারিয়ে গেছে সেই কোলাহলমুখর সাপ্তাহিক হাট। কিন্তু ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একটি শতবর্ষী শিশু (রেইন ট্রি) গাছ। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও ঝড়ের দাপটে রবিবার (১২ জুলাই) বিকেলে সেই গাছটিও গোড়াসহ উপড়ে পড়ে। এর মধ্য দিয়ে যেন হারিয়ে গেল পূর্ব চাম্বলের একটি জীবন্ত ইতিহাস, তিন প্রজন্মের স্মৃতি আর এক হারানো জনপদের শেষ নিদর্শন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চাম্বল কর্মকারপাড়া সংলগ্ন ঐতিহাসিক বাদশাহী সড়কের পাশে গড়ে উঠেছিল গোলাম গৌজের হাট। একসময় এটি ছিল এলাকার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। প্রবীণদের ভাষ্যমতে, কর্মকারপাড়ার বাসিন্দা প্রয়াত হরিশ চন্দ্র কর্মকার–যিনি তৎকালীন বাজারে ব্যবসা করতেন।নিজের দোকানের পাশে এই শিশু গাছটি রোপণ করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে হাট বিলুপ্ত হলেও গাছটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থেকে মানুষকে মনে করিয়ে দিত, এখানে একদিন জমজমাট বাজার বসত, মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত চারপাশ।
স্থানীয়দের মুখে মুখে এখনও ভেসে বেড়ায় সেই বাজারের নানা লোককথা। জনশ্রুতি রয়েছে, সাপ্তাহিক এ হাটে নাকি জিন-পরীরাও সওদা করতে আসত। গাছটির ছায়াতলে বসত যাত্রাপালার আসর, মিলনমেলা আর গ্রামীণ আড্ডা। বহু মানুষের শৈশব, কৈশোর ও জীবনের অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে ছিল এই গাছকে ঘিরে। তাই এটি কেবল একটি বৃক্ষ ছিল না; ছিল একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যের প্রতীক।
স্থানীয় অ্যাডভোকেট সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘চাম্বল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আসা মানুষ, দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ী, পথচারী–সবাই এই গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতেন। তপ্ত দুপুরে এটি ছিল প্রশান্তির আশ্রয়। প্রতিবছর চাম্বল বাজার পান ব্যবসায়ী সমিতির সভাও বসত এই গাছের নিচে। দুই শত বছরের পুরোনো হাট বিলুপ্ত হলেও এই গাছটিই তার স্মৃতি বহন করে আসছিল। এখানে একসময় বাঁশ, বেত এবং পানের বরজে ব্যবহৃত বাঁশের খুঁটির পাইকারি বেচাকেনা হতো। গাছটি ঘিরে অনেক অজানা গল্প ও রহস্যও প্রচলিত ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘গাছটি পড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে যেন ইতিহাসের একটি অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটল। আজ ছায়া নেই, হয়তো একসময় মানুষের স্মৃতি থেকেও হারিয়ে যাবে এই ঐতিহ্যবাহী হাটের গল্প।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য রহম উল্লাহ জানান, রবিবার বিকেল প্রায় ৩টার দিকে প্রবল বর্ষণ ও ঝোড়ো বাতাসে গাছটি গোড়াসহ উপড়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে গোড়ার মাটি ক্ষয়ে যাওয়ায় গাছটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির কাছে হার মানতে হয়েছে শতবর্ষী এই বৃক্ষকে।
প্রবীণ বাসিন্দাদের ধারণা, গাছটির বয়স প্রায় ১২০ বছর। বহুবার কিছু প্রভাবশালী মহল গাছটি কেটে ফেলতে চাইলেও স্থানীয়দের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে এটি এতদিন রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম আঘাতে শেষ পর্যন্ত আর টিকে থাকতে পারল না ইতিহাসের এই নীরব প্রহরী।
গাছটি ভেঙে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসেন সেটি দেখতে। কেউ স্মৃতিচারণ করেন শৈশবের, কেউ বলেন হারিয়ে যাওয়া বাজারের গল্প। অনেকের চোখেই ছিল বিষণ্নতা। তাঁদের ভাষায়, ‘গাছটি শুধু একটি বৃক্ষ ছিল না; এটি ছিল গোলাম গৌজের হাটের জীবন্ত পরিচয়। এর যথাযথ সংরক্ষণ করা হলে হয়তো আজ এমন পরিণতি দেখতে হতো না।’
একটি গাছের পতন কখনো কখনো কেবল প্রকৃতির ঘটনা নয়; তা একটি জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগেরও পতন। গোলাম গৌজের হাটের শতবর্ষী এই বৃক্ষের উপড়ে পড়া যেন পূর্ব চাম্বলের মানুষের বুক থেকে একটি জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ হারিয়ে যাওয়ার বেদনার নাম। আজ গাছটি নেই, কিন্তু তার ছায়ায় বেড়ে ওঠা অসংখ্য মানুষের স্মৃতি, গল্প আর ইতিহাস বহুদিন ধরে বেঁচে থাকবে স্থানীয়দের হৃদয়ে।