
সংলাপ ক্রিড়া ডেস্ক::: ফুটবলে সব গল্প ট্রফি দিয়ে লেখা হয় না। কিছু গল্প লেখা হয় অপেক্ষা, প্রত্যাখ্যান আর অদম্য বিশ্বাস দিয়ে। কেপ ভার্দের গোলরক্ষক জোসিমার ডায়াস—যাকে বিশ্ব চেনে ‘ভোজিনহা’ নামে—সেই বিরল গল্পেরই এক নায়ক।
একটি ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র, মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের দেশ কেপ ভার্দে। সেখান থেকে উঠে আসা একজন গোলরক্ষক ১৯ বছর পেশাদার ফুটবল খেলেও জিতেছেন মাত্র একটি ট্রফি। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, তার গল্প শেষ। কিন্তু জীবন কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি লিখে রাখে একেবারে শেষ পাতায়।
২০২৬ সালের ১ জুন। পর্তুগিজ ক্লাব শাভেসের সঙ্গে ভোজিনহার চুক্তি শেষ হয়ে যায়। ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষককে নতুন কোনো ক্লাব নিতে আগ্রহ দেখায়নি। অনিশ্চয়তার সেই সময়েই সামনে আসে জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ–প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার।
১৪ দিন পরই তিনি দাঁড়িয়ে যান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে। প্রতিপক্ষ স্পেন–শিরোপার অন্যতম দাবিদার। ম্যাচজুড়ে স্পেনের আক্রমণের পর আক্রমণ। ২৭টি শট, সাতটি লক্ষ্যে। কিন্তু গোলপোস্টের নিচে যেন এক অদৃশ্য দেয়াল। একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভে স্পেনকে হতাশ করেন ভোজিনহা। ম্যাচ শেষ হয় ০–০ গোলে।
সেই এক ম্যাচেই ইতিহাসের অংশ হয়ে যান তিনি। ৪০ বছর ১২ দিন বয়সে বিশ্বকাপ অভিষেকে ক্লিন শিট রাখা সবচেয়ে বয়স্ক গোলরক্ষক হিসেবে নিজের নাম লেখান ইতিহাসে। ম্যাচ শেষে চোখের জল লুকাতে পারেননি। কারণ, জীবনের সবচেয়ে বড় মুহূর্তটি গ্যালারিতে বসে দেখার সুযোগ হয়নি তার মায়ের।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তিনি প্রথম ম্যাচে উপস্থিত থাকতে পারেননি। পরে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় এলে নানা উদ্যোগের পর উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে গ্যালারিতে বসে ছেলের খেলা দেখার সুযোগ পান। একজন ফুটবলারের কাছে হয়তো সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এরপর আসে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নকআউট লড়াই। লিওনেল মেসির ফ্রি-কিকসহ একাধিক নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে আবারও আলোচনায় ভোজিনহা। শেষ পর্যন্ত কেপ ভার্দে ৩–২ গোলে হেরে বিদায় নিলেও, জয় করে নেয় কোটি মানুষের সম্মান।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোজিনহার অনুসারী ছিল ৫০ হাজারেরও কম। কয়েকটি ম্যাচের অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর সেই সংখ্যা পৌঁছে যায় কয়েক কোটিতে। একসময় যাকে নতুন ক্লাব খুঁজে পেতে সংগ্রাম করতে হয়েছে, তাকেই অনুসরণ করতে শুরু করে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ।
ভোজিনহার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাফল্য সব সময় দ্রুত আসে না। কখনো কখনো বছরের পর বছর নীরবে প্রস্তুতি নিতে হয়। সুযোগ যখন আসে, তখন সেই প্রস্তুত মানুষটিই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখান।
১৯ বছরের ক্যারিয়ার তাকে হয়তো মাত্র একটি ট্রফি দিয়েছে। কিন্তু মাত্র ১৮ দিনের বিশ্বকাপ তাকে এনে দিয়েছে এমন এক স্বীকৃতি, যা কোনো ট্রফির চেয়েও বড়–পৃথিবীজুড়ে মানুষের ভালোবাসা।