
চট্টগ্রামের গ্রামীণ সমাজে বহু পুরোনো কিছু সামাজিক রেওয়াজ আজও অলিখিত আইন হয়ে টিকে আছে সভ্যতার এ যুগে। সময় বদলেছে, সভ্যতা এগিয়েছে, মানুষের অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে–তবুও কিছু প্রথা এখনো মানুষের বিবেককে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে বন্দি করে রেখেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে লজ্জাজনক ও অপমানজনক একটি হলো–কোরবানির ঈদে শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইপক্ষের জন্য ছাগল পাঠানোর প্রথা।
এটি নিছক উপহার নয়, নিছক আন্তরিকতাও নয়; বরং বহু ক্ষেত্রে এটি সামাজিক চাপ, অঘোষিত দাবি এবং মানসিক শোষণের একটি ভয়াবহ রূপ।বিশেষত দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে এই রেওয়াজ এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মেয়ের বাবা যদি কোরবানির পশু পাঠাতে না পারেন, তবে তাকে সমাজের চোখে ‘অসামর্থ্যবান’ কিংবা ‘অসম্মানকারী’ হিসেবে দেখা হয়। আর সেই অপমানের ভার বহন করতে হয় কন্যা সন্তানকেই।ইসলামে কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি প্রতীকী আত্মত্যাগ। কিন্তু কোথাও বলা হয়নি, শ্বশুরবাড়ির পাঠানো পশু দিয়ে জামাইপক্ষ কোরবানি করবে। বরং ইসলামী শরীয়ত স্পষ্টভাবে আত্মমর্যাদা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যের ওপর কষ্ট চাপিয়ে দেয়, আল্লাহও তার ওপর কষ্ট চাপিয়ে দেন।’ অথচ সমাজে আজ এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে–মেয়ের বাবার সামর্থ্য থাক বা না থাক, তাকে ঈদের আগে কোরবানির পশুর ব্যবস্থা করতেই হবে। অন্যতায় শ্বাশুর বাড়িতে তার মেয়েকে নানা অপমানের বোঝা নিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে থাকতে হবে জনমজনম।
প্রশ্ন হলো, কেন? ছেলে সন্তানের অভিভাবক হওয়া কি কোনো বিশেষ অর্থনৈতিক লাইসেন্স? মেয়েকে বিয়ে দিয়ে কি একজন বাবা আজীবনের দায়গ্রস্ত হয়ে যান? কেন একটি মেয়ের বিয়ের পরও তার পিতৃপরিবারকে অব্যাহতভাবে সামাজিক দেনার বোঝা টানতে হবে? বাস্তবতা হচ্ছে, এই প্রথাগুলো নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং দায়বদ্ধ সম্পদ হিসেবে উপস্থাপন করে। যেন কন্যাসন্তান মানেই এক অনন্ত ব্যয়ের খাতা। বিয়ের দিন যৌতুক, পরে মৌসুমি ফল, রমজানে ইফতার, ঈদে কাপড়, সন্তান হলে আকীকার ছাগল, আর কোরবানিতে পশু–এই অন্তহীন দাবির সংস্কৃতি নারীর মর্যাদাকে ক্ষতবিক্ষত করছে প্রতিনিয়ত। একজন নারী তখন আর পরিবারের সম্মানিত সদস্য থাকেন না; বরং হয়ে ওঠেন দুই পরিবারের মাঝখানে আটকে থাকা এক নীরব চাপের প্রতীক। নারী এখানেই চরম অবলা যেন কোনো প্রাণিই!
চট্টগ্রামের গ্রামীণ সমাজে এ প্রথা কেন্দ্র করে পারিবারিক কলহ, সম্পর্কের অবনতি এমনকি নির্যাতনের ঘটনাও অপ্রচলিত নয়। সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়–শ্বশুরবাড়ির চাহিদা পূরণ করতে না পারায় নববধূকে অপমান, মানসিক নির্যাতন কিংবা সংসারে অশান্তির শিকার হতে হয়েছে।কয়েক বছর আগে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় ঈদ উপলক্ষে ‘যথাযথ উপঢৌকন’ না পাঠানোকে কেন্দ্র করে দাম্পত্য বিরোধের ঘটনাও আলোচনায় আসে। যদিও এসব ঘটনা অনেক সময় আনুষ্ঠানিক অভিযোগে রূপ নেয় না, কিন্তু সমাজের ভেতরে এর ক্ষত রয়ে যায় দীর্ঘদিন।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো–এই প্রথাকে এখন অনেকেই সামাজিক মর্যাদার অংশ মনে করেন। বড় পশু পাঠানো মানে সম্মান, বেশি উপহার মানে সম্পর্কের দৃঢ়তা–এমন এক বিকৃত প্রতিযোগিতা সমাজে তৈরি হয়েছে। এতে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেয়ের বিয়ের পরও বছরের পর বছর তারা ঋণ, চাপ ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে জীবন কাটান। একজন বাবা নিজের সন্তানের মুখে খাবার কমিয়ে হলেও ‘সমাজের নিয়ম’ রক্ষা করতে বাধ্য হন। এটি কি সভ্যতার লক্ষণ? নাকি সভ্যতার আড়ালে যাঁতাকল? যেখানে কন্যাদ্বায়গ্রস্থ পরিবার ঢেঁকির তলে চাউল!
প্রকৃতপক্ষে, ভালোবাসা কখনো দাবির ভাষায় প্রকাশ পায় না। আন্তরিকতা কখনো সামাজিক চাপের মাধ্যমে আদায় করা যায় না। শ্বশুরবাড়ি থেকে কেউ স্বেচ্ছায় ভালোবেসে কিছু পাঠালে তা এক বিষয়; কিন্তু সেটিকে অলিখিত বাধ্যবাধকতায় পরিণত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সেখানে ভালোবাসা থাকে না, থাকে কেবল সামাজিক ডাকাতির এক নীরব সংস্করণ। এই প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমে দরকার সামাজিক সচেতনতা। ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, শিক্ষিত সমাজ, জনপ্রতিনিধি এবং তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে ছেলেপক্ষকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে–’আমরা কোনো দাবি করব না, কোনো চাপ সৃষ্টি করব না।’ কারণ পরিবর্তনের শুরুটা সবসময় সুবিধাভোগী পক্ষ থেকেই হতে হয়।
চট্টগ্রামের সমাজ ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ, সংস্কৃতিতে উজ্জ্বল। এই সমাজের মানুষ মানবিকতা, অতিথিপরায়ণতা ও সৌহার্দ্যের জন্য পরিচিত। সেই সমাজে নারীর পরিবারকে আর্থিক চাপে ফেলে সম্মান আদায়ের সংস্কৃতি কখনো গৌরবের হতে পারে না। বরং এটি আমাদের সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। সময় এসেছে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কোরবানির পশু হোক নিজের সামর্থ্যে, নিজের দায়িত্বে। শ্বশুরবাড়ির পাঠানো ছাগল নয়, বরং আত্মমর্যাদা ও মানবিকতা হোক সম্পর্কের ভিত্তি।কারণ, কন্যাসন্তান কোনো দায় নয়–তিনি একজন মানুষ, একজন সম্মানিত নাগরিক, একজন পরিবারের গর্ব। তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সব ধরনের অপমানজনক প্রথার অবসানই একটি সভ্য সমাজের প্রথম শর্ত।
লেখক-
শিব্বির আহমদ রানা
(গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট)
ই-মেইল: shibbirahmedctg1990@gmail.com