
বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীদের ওপর, কারণ আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু বর্তমানে একটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তারা নিয়মিত বিদ্যালয়, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত হয় না, পড়াশোনায় মনোযোগ দেয় না এবং অনেক সময় বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তাই শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানমুখী করা বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়; এটি একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব গঠন, নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের অন্যতম ক্ষেত্র। বিদ্যালয় বা কলেজে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষক, সহপাঠী ও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে বাস্তব জীবনের নানা শিক্ষা লাভ করে। কিন্তু যখন শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে সরে যায়, তখন তারা এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো থেকে বঞ্চিত হয়।
বর্তমানে শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানবিমুখ হওয়ার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। প্রথমত: প্রযুক্তির অপব্যবহার একটি বড় কারণ। অনেক শিক্ষার্থী মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে। ফলে তাদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যায়।
দ্বিতীয়ত: পারিবারিক অবহেলাও একটি কারণ। অনেক অভিভাবক সন্তানদের যথাযথভাবে তদারকি করেন না। তারা সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে বা কী করছে–এসব বিষয়ে উদাসীন থাকেন।
তৃতীয়ত: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ অনেক সময় শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সহশিক্ষা কার্যক্রম নেই, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক দুর্বল, কিংবা পাঠদান পদ্ধতি একঘেয়ে হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিরক্ত হয়। এছাড়া দারিদ্র্য, পারিবারিক সমস্যা, খারাপ বন্ধুর সংস্পর্শ এবং কিশোর গ্যাংয়ের মতো সামাজিক সমস্যাও শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
শিক্ষার্থীরা যখন প্রতিষ্ঠানবিমুখ হয়ে পড়ে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের ওপর পড়ে। পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাওয়া শিক্ষার্থীরা সহজেই অপরাধ, মাদকাসক্তি, বেকারত্ব ও সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এতে পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি পায়। একটি দেশের শিক্ষিত জনশক্তি কমে গেলে জাতীয় উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হয়।
শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানমুখী করতে হলে প্রথমেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে আরও আকর্ষণীয় ও শিক্ষাবান্ধব করে তুলতে হবে। আধুনিক ও আনন্দদায়ক পাঠদান পদ্ধতি চালু করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে। পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিজ্ঞান মেলা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে।
শিক্ষকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন, তিনি একজন আদর্শ পথপ্রদর্শক। শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করলে তারা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহী হবে।
অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। সন্তানদের পড়াশোনার খোঁজখবর নেওয়া, তাদের ভালো বন্ধু নির্বাচন করতে সাহায্য করা এবং নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় থাকলে শিক্ষার্থীরা সহজেই সঠিক পথে চলতে পারবে।
সরকারকেও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কিশোর অপরাধ ও মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানমুখী করা শুধু শিক্ষা খাতের নয়, বরং পুরো জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিক্ষার্থীরা যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহী হয়, তবে তারা সুশিক্ষিত নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে এবং দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই পরিবার, শিক্ষক, সমাজ ও সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানমুখী করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
লেখক-
আছেফুর রহমান ফারুকী
প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত)
রামপুর সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়।