
শিব্বির আহমদ রানা::: টানা চারদিনের অতিপ্রবল বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী কার্যত বিচ্ছিন্ন জনপদে পরিণত হয়েছে। উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গিয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে অধিকাংশ এলাকা, ব্যাহত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ। পাহাড়ি এলাকার ছড়া-খাল ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ দীর্ঘদিন ধরে দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত প্রতিবন্ধকতার কারণে এবারও দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
উপজেলার ছনুয়া, পুঁইছড়ি, শেখেরখীল, চাম্বল, শীলকূপ, গন্ডামারা, জলদি, সরল, কাথরিয়া, বৈলছড়ি, কালীপুর, বাহারছড়া, খানাখানাবাদ ও সাধনপুরসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। প্রধান সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি।
সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেচুরিয়া পুরাতন ব্রিজসংলগ্ন এলাকায়। বুধবার (৮ জুলাই) রাতে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত লোকালয়ে ঢুকে পড়লে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ বেশ কয়েকটি পরিবার নিজ ঘরেই আটকা পড়ে। পরিস্থিতির অবনতি হলে স্থানীয়দের জরুরি ফোন পেয়ে উদ্ধার অভিযানে নামে বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, রাত সাড়ে ৮টার দিকে একটি উদ্ধারকারী ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঝুঁকি নিয়ে অভিযান শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় ৮ জন নারী ও ৫ জন শিশুসহ মোট ১৩ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করে স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। রাত ১১টা ৫০ মিনিটে অভিযান শেষ হয়। এ ঘটনায় কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘পানির উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েকটি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে নারী ও শিশুসহ ১৩ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করেন। দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকা আমাদের দায়িত্ব, সেই দায়িত্ব পালনে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।’
উদ্ধার অভিযানের সময় ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের কাঁধে করে একটি পরিবারের ৮ মাস বয়সী শিশুকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। দুর্যোগের মধ্যে মানবিক ও সাহসী ভূমিকার জন্য ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রতিবছর একই চিত্র কেন? তাদের দাবি, পাহাড়ি ছড়া, খাল ও পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ দখল, ভরাট এবং যথাযথ সংস্কারের অভাবে সামান্য অতিবৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের অভাবে বছরের পর বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। স্থানীয়রা অবিলম্বে ছড়া-খাল পুনরুদ্ধার, পানি নিষ্কাশনের পথ উন্মুক্তকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টেকসই অবকাঠামোগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।