রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বাঁশখালীতে গৃহবধূর মৃত্যু, আগের দণ্ডপ্রাপ্ত পল্লিচিকিৎসককে ঘিরে অভিযোগ মোজাম্বিক থেকে দেশে ফেরার পথে বিমানে প্রাণ গেল বাঁশখালীর জসিমের ছনুয়ায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক আলোচনা সভা বাঁশখালীর কাথরিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শুরু নরমাল ডেলিভারি সেবা খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন হলেন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী দুই জোড়া জুতোই দিল সংকেত, বাঁশখালীতে পুকুরে মিলল দুই শিশুর মরদেহ ক্রিকেটের মাঠে মেয়েরা, মাদকবিরোধী লড়াইয়ে তরুণরা–বাঁশখালীতে ওসির ব্যতিক্রমী উদ্যোগ বাঁশখালীতে চিকিৎসাসেবায় নতুন উদ্যোগ, ১০ অক্টোবর শেভরণের শাখা উদ্বোধন গার্ডেন ভিউ ন্যাশনাল একাডেমী কর্তৃক এসএসসি ২৬ কৃতি শিক্ষার্থীদের বর্ণিল সংবর্ধনা ১৩২০ মেগাওয়াটের আলো, ৪২ মেগাওয়াটের অন্ধকারে বাঁশখালীর দুর্ভোগ আর কতদিন?

শেষ সম্বল আঁকড়ে বর্ষার সঙ্গে লড়ছে দিনমজুর ফজল করিমের পরিবার

  • প্রকাশিত: বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ২৫৩ বার পড়া হয়েছে

তৌহিদ-উল বারী, বার্তা সম্পাদক, বাঁশখালী সংলাপ:::বর্ষা কারও কাছে প্রেমের ঋতু, কারও কাছে সবুজের উৎসব। কিন্তু বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মাতব্বর পাড়ার দিনমজুর ফজল করিমের কাছে বর্ষা মানেই আতঙ্ক, দীর্ঘশ্বাস আর নির্ঘুম রাতের নাম।

যখন টানা বর্ষণে চারদিকে বৃষ্টির শব্দে প্রকৃতি মুখরিত হয়, তখন ফজল করিমের পরিবারের কানে সেই শব্দ শোনায় মৃত্যুভয়ের মতো। প্রতিটি ফোঁটা বৃষ্টি যেন আঘাত হানে তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল- ছেঁড়া জাল, পুরোনো পলিথিন ও জোড়াতালি দেওয়া একটি ভাঙাচোরা কাঁচা ঘরের ওপর।

পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের ‘আসমানী’ কবিতায় ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের যে নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছিল, বাস্তবের বাঁশখালীতে এসে মনে হয়, সেই আসমানীর ঘরও যেন হার মেনে যায় ফজল করিমের এই আশ্রয়ের কাছে।

দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এটি একটি বসতঘর। মনে হয়, বহু বছর আগে পরিত্যক্ত কোনো কুঁড়েঘর এখনো কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। চালের ছন প্রায় নেই বললেই চলে। যেখানে ছাউনি থাকার কথা, সেখানে ঝুলছে ছেঁড়া মাছ ধরার জাল, পুরোনো পলিথিন, ছিন্ন ত্রিপল আর শুকিয়ে যাওয়া পাতা। কাদামাটির দেয়ালজুড়ে বড় বড় ফাটল। কোথাও মাটি খসে পড়েছে, কোথাও বাঁশ বেরিয়ে এসেছে। পুরো ঘরটি যেন কেবল ভাগ্যের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে।

এই ঘরটিই ফজল করিমের শেষ সম্বল।

পিতা আব্দুর রহমানের ছেলে ফজল করিম পেশায় একজন দিনমজুর। কখনও লবণ পরিবহন করেন, কখনও অন্যের কাজ করে যা পান, তা দিয়েই চলে ছয় সদস্যের সংসার। চার সন্তানের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে প্রতিদিন ভোরে বেরিয়ে পড়েন তিনি। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফিরে আসেন এমন একটি ঘরে, যেখানে নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

বছরের পর বছর কষ্ট করে গড়া এই ছোট্ট কাঁচা ঘরটিই তার সব। জমিজমা নেই, পাকা বাড়ি নেই, ব্যাংকে সঞ্চয় নেই। এই ভাঙা ঘরটুকুই তার জীবনের একমাত্র আশ্রয়, শেষ সম্বল, শেষ ভরসা।

প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর আগে তৈরি করা ঘরটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীর্ণ হয়েছে। কিন্তু অভাবের সংসারে সেটি সংস্কারের সামর্থ্যও আর হয়ে ওঠেনি। তাই ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টি পড়লে নতুন টিন নয়, নতুন ছাউনি নয়- পুরোনো পলিথিন টেনে দেওয়াই হয়ে ওঠে একমাত্র সমাধান। ছিঁড়ে গেলে তার ওপর আবার জুড়ে দেওয়া হয় আরেক টুকরো পলিথিন, কখনও ছেঁড়া জাল।

গত কয়েকদিন ধরে টানা বর্ষণে বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢল, জোয়ারের পানি আর অবিরাম বৃষ্টিতে মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে। কিন্তু এসব দুর্ভোগের মধ্যেও সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় রয়েছেন ফজল করিমের মতো নিম্নআয়ের মানুষরা।

বৃষ্টি শুরু হলেই তাদের ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। কোথাও হাঁড়ি রেখে, কোথাও বালতি রেখে, কোথাও কাপড় গুঁজে পানি আটকানোর চেষ্টা চলে। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে সেই লড়াই কতক্ষণ?

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে আতঙ্কও। ঘুমিয়ে থাকা সন্তানদের দিকে তাকিয়ে বুক কেঁপে ওঠে বাবা-মায়ের। যদি হঠাৎ কাদামাটির দেয়াল ধসে পড়ে? যদি প্রবল বাতাসে ছাউনি উড়ে যায়? যদি গভীর রাতে পুরো ঘর ভেঙে পড়ে?

এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই তাদের কাছে।

চার সন্তানকে নিয়ে প্রতিটি বর্ষার রাত পার হয় অজানা আশঙ্কায়। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি, ভেতরে টপটপ করে পড়া পানি আর ভেঙে পড়ার ভয়- এই দুইয়ের মাঝখানে কেটে যায় তাদের রাত।

আজ যখন চারদিকে বহুতল ভবনের সারি, আধুনিক ডুপ্লেক্স বাড়ির ঝলক, তখন সেই দালানের বারান্দায় ঝুলে থাকা ছোট্ট একটি পাখির বাসাও যেন ফজল করিমের ঘরের চেয়ে বেশি নিরাপদ বলে মনে হয়।

একদিকে বিলাসী জীবনের প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে একজন শ্রমজীবী মানুষের শেষ সম্বলটুকুও হারানোর আশঙ্কা- এই বৈপরীত্যই যেন আজকের সমাজের বাস্তব চিত্র।

ফজল করিম কোনো দান চান না, বিলাসিতাও চান না। তিনি শুধু চান এমন একটি নিরাপদ ঘর, যেখানে বৃষ্টি নামলে সন্তানদের নিয়ে ভয়ে ভয়ে রাত কাটাতে হবে না। যেখানে প্রতিটি বজ্রপাতের সঙ্গে মনে হবে না- এই বুঝি সব শেষ হয়ে গেল।

বাঁশখালীর মতো জনপদে ফজল করিম একা নন। এমন আরও অনেক পরিবার রয়েছে, যাদের জীবন প্রতিটি বর্ষায় নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়ে। কিন্তু তাদের গল্প খুব কমই সামনে আসে। উন্নয়নের পরিসংখ্যানের ভিড়ে হারিয়ে যায় তাদের দীর্ঘশ্বাস।

ফজল করিমের এই ভাঙাচোরা কাঁচা ঘর তাই শুধু একটি পরিবারের ঠিকানা নয়; এটি দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতার প্রতীক, বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি এবং সমাজের বিবেকের সামনে রাখা এক নীরব প্রশ্ন।

টানা বর্ষণে যখন মানুষ ঘরের জানালা বন্ধ করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে, তখন ফজল করিমের পরিবার দু’হাত তুলে ছেঁড়া পলিথিন চেপে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কারণ তারা জানে-এই ভাঙা ঘরটিই তাদের শেষ সম্বল। এই ঘরটি ভেঙে গেলে শুধু চারটি দেয়াল নয়, ভেঙে পড়বে একটি পরিবারের শেষ আশ্রয়, শেষ স্বপ্ন, শেষ নিরাপত্তাবোধও।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews