রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
বাঁশখালীর কুমারপাড়ায় মাটির চাকা ঘোরে, ঘোরে না ভাগ্যের চাকা বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ২৪৪ পরিবারকে কুরআন রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ১৫ লাখ টাকা সহায়তা বাঁশখালীতে মোটরসাইকেলে মিলল ১৮ হাজার ইয়াবা, গ্রেপ্তার ১ বাঁশখালীতে জানালার রড বেঁকিয়ে বসতঘরে চুরি, লুট ১০ লাখ টাকার মালামাল এতিম শিশুদের নিয়ে মোজাম্মেল হক মানব কল্যাণ ফাউন্ডেশনের বৃক্ষরোপণ ও ভোজন কর্মসূচি বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উদ্যোগ, বাঁশখালীতে সেবা পেলেন ৪০০ জন অস্পষ্ট প্রেসক্রিপশন: চিকিৎসাব্যবস্থার নীরব ঝুঁকি বাঁশখালীতে ‘সাব-জেল’ নির্মাণের প্রস্তাব বাঁশখালীর মাঠ থেকে বিকেএসপির স্বপ্নের আঙিনায় তানভীর বাঁশখালীতে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা

বাঁশখালীর কুমারপাড়ায় মাটির চাকা ঘোরে, ঘোরে না ভাগ্যের চাকা

  • প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

|পুঁজি ও আধুনিক যন্ত্রের অভাবে পিছিয়ে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প, নতুন প্রজন্মেরও নেই আগ্রহ|

শিব্বির আহমদ রানা:: একসময় গ্রামের ঘরে ঘরে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলস, সরা, মালসা ও নানা ধরনের তৈজসপত্র ছিল নিত্যদিনের ব্যবহার্য। রান্নাঘর থেকে পূজার আয়োজন–সবখানেই ছিল মাটির তৈরি সামগ্রীর ব্যবহার। সময়ের সঙ্গে অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, প্লাস্টিক ও মেলামাইনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বদলে গেছে সেই চিত্র। তবে বিলীন হয়নি মাটির সঙ্গে মানুষের পুরোনো সম্পর্ক। বাঁশখালীর কয়েকটি কুমারপাড়ায় এখনো বংশপরম্পরায় টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। তবে পুঁজি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও বাজারসংকটে সম্ভাবনাময় এই শিল্প এখন অনেকটাই অস্তিত্বসংকটে।

বাঁশখালীর সাধনপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ সাধনপুর ও উত্তর সাধনপুরের রৌদ্রপাড়ায় প্রায় শতাধিক পরিবার, কালীপুর ইউনিয়নের কুমারপাড়ায় ৭ থেকে ৮টি পরিবার, বাঁশখালী পৌরসভার পূর্বাংশের কুমারপাড়া, পুকুরিয়া ও চাম্বল ইউনিয়নের কিছু এলাকায় এখনো কুমাররা মাটির হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পেশা তাদের কাছে শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, বাপ-দাদার ঐতিহ্যেরও অংশ।

কারিগররা জানান, চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকা, বান্দরবান ও বাজালিয়া থেকে পাইকাররা তাদের তৈরি পণ্য কিনতে আসেন। তবে পুরোনো পদ্ধতিতে তৈরি পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য সীমিত হওয়ায় বাজারে চাহিদা আগের তুলনায় অনেক কম। সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত নকশা ও পর্যাপ্ত পুঁজি পাওয়া গেলে এই শিল্পকে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

সাধনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. এজাজ বলেন, ‘আমার সাধনপুর ইউনিয়নের শুধু দক্ষিণ সাধনপুরেই ৭০ থেকে ৮০ পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত। যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় তারা এ শিল্পকে ধরে রেখেছে। আমার এলাকায় দু’জন কুমার আধুনিক মাটির শিল্পকর্ম তৈরির প্রশিক্ষণ পেলেও পুঁজি ও যন্ত্রপাতির অভাবে ব্যাপকভাবে কাজ করতে পারছেন না।’ তিনি বলেন, ‘স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও এনজিও সংস্থা ইপসার সহায়তায় গত বছর বরিশাল থেকে মৃৎশিল্পের আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বিষয়ে পুরো উপজেলা থেকে ৮ থেকে ১০ জনকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাদের প্রশিক্ষণ থাকলেও অর্থের অভাবে তা কাজে লাগাতে পারছেন না।’

সাধনপুর রৌদ্রপাড়ার কারিগর সঞ্জিত রুদ্র প্রায় এক যুগ ধরে এই পেশায় আছেন। মা-বাবা অসুস্থ হওয়ার পর পারিবারিক ঐতিহ্যের এই পেশাকে আঁকড়ে ধরেন তিনি। প্রশিক্ষণ নিয়েছেন আধুনিক পদ্ধতিতে কাজ করার, কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও পুঁজি না থাকায় এখনো পুরোনো পদ্ধতিতেই কাজ করতে হচ্ছে তাকে। সঞ্জিত রুদ্র বলেন, ‘আমরা আধুনিক পদ্ধতিতে তৈরি করতে পারি না। ফলে মালের কোয়ালিটি ভালো হয় না, ভালো দামও পাই না। মূলত পূজাকেন্দ্রিক শিল্পকর্ম তৈরি হয়। বাজারেও তেমন চাহিদা নেই। যুগ যুগ ধরে এ পেশায় আছি, ধরে রেখেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবছর মাটি কেনা, লাকড়ি, খড় সংগ্রহ ও চুল্লি তৈরি করাসহ সব মিলিয়ে আমার প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়। সারা বছরের পুঁজির বিপরীতে আয় হয় চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা। অনেক সময় মূলধনও খুঁজে পাওয়া যায় না।’

কালীপুর ইউনিয়নের রুদ্রপাড়ার বিশ্বনাথ রুদ্রও বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। কাজে স্ত্রীও তাকে সহযোগিতা করেন। তিনি বলেন, ‘বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রেখেছি। আমাদের সন্তানেরা এসব থেকে বিমুখ। বাজারে চাহিদা নেই, ব্যয়ও কমে না। তারপরও পুরোনো চাকায় হাতের তৈরি মৃৎশিল্পের কাজ করে সংসার চালাই।’ প্রশিক্ষণ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বনাথ রুদ্র বলেন, ‘প্রশিক্ষণ নিয়ে কী করব? যন্ত্রপাতি কীভাবে কিনব, পুঁজি তো নেই। আমরা কোনো রকমে এ শিল্প ধরে রেখেছি। আমার পরবর্তী প্রজন্ম এ শিল্পে আগাবে না।’

কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৃৎশিল্প তৈরির পুরো প্রক্রিয়াই এখনো অনেকটা শ্রমনির্ভর। প্রথমে মাটি সংগ্রহ করে পরিষ্কার ও নরম করা হয়। এরপর পানি মিশিয়ে কাদায় পরিণত করে প্রয়োজনমতো পিটিয়ে বা মথে প্রস্তুত করা হয়। সেই মাটি কুমারের চাকায় বসিয়ে হাতের চাপ ও আঙুলের নিপুণতায় ধীরে ধীরে দেওয়া হয় কাঙ্ক্ষিত আকৃতি। এরপর রোদে শুকিয়ে কাঠ, খড়, লাকড়ি কিংবা অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহার করে তৈরি চুল্লিতে পুড়িয়ে শক্ত করা হয়।

এই পুরোনো পদ্ধতির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃৎশিল্পে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। বৈদ্যুতিক বা মোটরচালিত চাকা, উন্নত কিলন, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় পোড়ানোর প্রযুক্তি, মাটি পরিশোধনের যন্ত্র, আধুনিক গ্লেজ ও রঙ ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে বাহারি ও নান্দনিক পণ্য। হাঁড়ি-পাতিলের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ফুলের টব, কাপ-প্লেট, মগ, শোপিস, ওয়াল ডেকোরেশন ও টেরাকোটার নানা সামগ্রী।

কিন্তু বাঁশখালীর অধিকাংশ কুমার সেই প্রযুক্তির নাগালের বাইরে। ফলে উৎপাদনে সময় ও শ্রম বেশি লাগলেও সে অনুযায়ী বাড়ছে না আয়। ভালো মানের মাটি সংগ্রহ ও পরিবহন, জ্বালানি, শুকানোর জায়গা এবং বর্ষাকালে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া–সব মিলিয়ে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। তার ওপর স্থানীয় বাজারে সীমিত চাহিদা এবং পাইকারদের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে অনেক সময় ন্যায্য দামও পান না কারিগররা।

বাঁশখালী উপজেলা এনজিও বিষয়ক সমন্বয়কারী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সাধনপুরের কিছু কারিগর আমাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। তাদের সহজ কিস্তিতে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে বসে কীভাবে এ শিল্পকে সমৃদ্ধ করা যায়, তা দেখব।’

উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. শওকতুজ্জামান বলেন, ‘মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত কেউ আমার অফিসে আসেননি। তারা এলে সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব। প্রশিক্ষণ সনদ থাকলে ঋণ দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। তাদের বিষয়টি নিয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করব।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৃৎশিল্পকে শুধু পুরোনো হাঁড়ি-পাতিল তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এই শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। মানুষের রুচি ও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নকশা ও আধুনিক পণ্য তৈরিতে কারিগরদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি পাইকারি বাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং অনলাইনভিত্তিক বিপণনের সুযোগ তৈরি করা গেলে বাঁশখালীর মৃৎপণ্য স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে।

মৃৎশিল্পীদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে স্বল্পসুদে ঋণ, আধুনিক চাকা ও কিলন সরবরাহ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য স্থায়ী বাজার তৈরি করা জরুরি। প্রয়োজনে কুমারপাড়াগুলোকে ঘিরে ক্ষুদ্র ‘মৃৎশিল্প পল্লি’ গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে প্রশিক্ষণকেন্দ্র, প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র, কাঁচামাল সংরক্ষণ এবং আধুনিক পোড়ানোর ব্যবস্থা থাকলে ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকেও এ পেশায় আকৃষ্ট করা সম্ভব।

কথিত আছে, বাঁশখালীতে মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য দুই থেকে আড়াই শত বছর পুরোনো। সেই দীর্ঘ ঐতিহ্য এখন টিকে আছে কয়েকটি পরিবারের শ্রম ও নিষ্ঠায়। কিন্তু দীর্ঘ শ্রমের তুলনায় আয় কম, বাজার অনিশ্চিত এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে পেশাটির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহও কমছে।

কুমারপাড়ার মাটির চাকা তাই শুধু একটি পেশার চাকা নয়, এটি বাঁশখালীর লোকজ ঐতিহ্যেরও প্রতীক। সময়ের সঙ্গে মানুষের ব্যবহার ও রুচি বদলেছে, বাজার বদলেছে; কিন্তু মাটিকে পাত্রে রূপ দেওয়ার সেই শিল্প এখনো টিকে আছে কয়েকটি পরিবারের হাতে। প্রশ্ন হলো–এই ঐতিহ্য কি কেবল স্মৃতি হয়ে থাকবে, নাকি আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে? সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে মাটির এই পুরোনো শিল্পই হয়ে উঠতে পারে নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও আয়ের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

ছবি: বাঁশখালীর কালীপুর কুমার পাড়ায় মৃৎশিল্প তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews