
বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। মানুষের জীবন, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু, পানি, মাটি এবং প্রকৃতির সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষায় বনের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু আমাদের উন্নয়নচিন্তা ক্রমেই এমন এক পথে এগোচ্ছে, যেখানে বনকে দেখা হচ্ছে খালি জমি হিসেবে, পাহাড়কে নির্মাণসামগ্রী হিসেবে এবং বন্যপ্রাণীকে মানুষের উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি আজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মানুষ ও বন্য হাতির সংঘাতে। বাংলাদেশের বনাঞ্চল ও পাহাড়ে মানুষের অনুপ্রবেশ বেড়েছে। বন কেটে বসতি গড়ে উঠেছে, কৃষিজমি সম্প্রসারিত হয়েছে, হাতির প্রাচীন চলাচলপথ দখল হয়েছে। মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ, সড়ক ও নানা অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। উন্নয়ন প্রয়োজন–এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু উন্নয়নের নামে যদি একটি বিপন্ন প্রজাতির আবাসস্থল নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তবে সেই উন্নয়নের মূল্য শেষ পর্যন্ত মানুষকেই দিতে হবে। হাতিকে বলা হয় প্রকৃতির ‘ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার’। এই পরিচয় কেবল বিশেষণ নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর পরিবেশগত বাস্তবতা। হাতি বনাঞ্চলে বিচরণ করে ঝোপঝাড় ও ঘন উদ্ভিদের কাঠামো পরিবর্তন করে, বিভিন্ন উদ্ভিদের বীজ বহন করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে দেয় এবং বন পুনর্জন্মে ভূমিকা রাখে। হাতির চলাচলে বনাঞ্চলের বিভিন্ন প্রাণীর জন্য পথ তৈরি হয়। এর খাদ্যাভ্যাস ও বিচরণ বনভূমির উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক কাঠামোতেও প্রভাব ফেলে।
অর্থাৎ, হাতি হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল একটি বড় প্রাণীর বিলুপ্তি নয়; এর অর্থ একটি জটিল বাস্তুতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ক্ষতি। যে বন হাতির আবাস, সেই বনই অসংখ্য প্রাণী, উদ্ভিদ ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবু আমরা হাতির আবাসস্থল ক্রমাগত সংকুচিত করছি। হাতির চলাচলের পথ বন্ধ করে সেখানে বসতি স্থাপন করছি। তারপর সেই পথ ধরে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়লে তাকেই ‘উপদ্রব’ হিসেবে চিহ্নিত করছি। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাতি মানুষের এলাকায় আসেনি; মানুষই হাতির আবাসস্থলে ঢুকে পড়েছে।
পুরোনো জরিপে চলবে না হাতি সংরক্ষণঃ বাংলাদেশে বর্তমানে বন্য হাতির প্রকৃত সংখ্যা কত–এই প্রশ্নেরও কোনো হালনাগাদ, নির্ভুল উত্তর নেই। সর্বশেষ জাতীয় হাতি জরিপ হয়েছিল ২০১৬ সালে। সেই জরিপে দেশে ২৬৮টি বন্য হাতি শনাক্ত হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন জাতীয় জরিপ না হওয়া উদ্বেগজনক।সংরক্ষণনীতি তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। অথচ প্রায় এক দশক পুরোনো পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করে আজকের হাতি সংরক্ষণ পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে, হাতির মৃত্যু ঘটেছে, মানুষ-হাতি সংঘাত বেড়েছে এবং বনাঞ্চলের চরিত্র বদলেছে। ফলে নতুন ও বৈজ্ঞানিক জাতীয় জরিপ এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি জরুরি প্রয়োজন।বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত বন বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের তথ্যে দেখা গেছে, গত এক দশকে দেশে শতাধিক হাতির মৃত্যু ঘটেছে। বৈদ্যুতিক ফাঁদ, শিকার, দুর্ঘটনা, খাদ্যসংকট, আবাসস্থল ধ্বংসসহ নানা কারণে হাতি মারা গেছে। অন্যদিকে, হাতির আক্রমণে মানুষেরও প্রাণহানি ঘটেছে। এই দুই বাস্তবতাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, একই সংকটের দুই প্রান্তে রয়েছে মানুষ ও হাতি।
চুনতি বন্যপ্রাণি সংরক্ষণের পরীক্ষাগার সময়ের দাবিঃ চট্টগ্রামের চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যভিত্তিক বনাঞ্চল এবং বন্য হাতির আবাস ও চলাচল এলাকার একটি। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বনাঞ্চল, পার্বত্য এলাকার বন এবং হাতির বিভিন্ন চলাচলপথের সঙ্গে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ রয়েছে। কিন্তু চুনতিও নিরাপদ নয়। বনভূমির ওপর চাপ বাড়ছে, জনবসতি সম্প্রসারিত হচ্ছে, কৃষিজমি বাড়ছে এবং হাতির স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। ফলে হাতি লোকালয়ে প্রবেশ করছে, ফসলের ক্ষতি করছে এবং কখনো কখনো মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এর প্রতিক্রিয়ায় হাতিও প্রতিশোধমূলক সহিংসতার শিকার হচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন তথ্যে চুনতি ও বাঁশখালী অঞ্চলে গত এক দশকে একাধিক হাতির অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা উঠে এসেছে। বৈদ্যুতিক ফাঁদ, শিকার, দুর্ঘটনা ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট কারণ এসব মৃত্যুর পেছনে রয়েছে। একই সময়ে হাতির আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এই বাস্তবতা আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়–চুনতির বনাঞ্চল কি সত্যিই একটি কার্যকর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে টিকে আছে, নাকি কেবল কাগজে-কলমে সংরক্ষিত এলাকা?
হাতির মৃত্যু মানে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাঃ সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ফসল রক্ষার নামে বিদ্যুতের ফাঁদ পেতে হাতি হত্যার ঘটনা। একটি প্রাণীকে বিদ্যুতায়িত তারে হত্যা করা শুধু নির্মমতাই নয়; এটি আইন, পরিবেশ এবং সভ্যতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এখানে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দায়ী করলেই চলবে না। প্রশ্ন হলো–কেন একজন কৃষক এমন পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছেন? তার ফসল নষ্ট হলে ক্ষতিপূরণ কি সময়মতো পাওয়া যায়? বন বিভাগের সতর্কতা ব্যবস্থা কি কার্যকর? হাতি লোকালয়ে ঢোকার আগে মানুষকে সতর্ক করার ব্যবস্থা আছে কি? প্রশিক্ষিত দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল কি যথেষ্ট? একটি হাতির মৃত্যুতে যেমন প্রকৃতির ক্ষতি হয়, তেমনি একজন কৃষকের একমাত্র ফসল নষ্ট হলেও তার জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। তাই মানুষ ও হাতির সংঘাতের সমাধান শুধু আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রয়োজন ন্যায়সঙ্গত ও বাস্তবভিত্তিক সহাবস্থানের নীতি।
করিডর রক্ষা ছাড়া সমাধান নেইঃ মানুষ-হাতি সংঘাতের সবচেয়ে কার্যকর সমাধানগুলোর একটি হলো হাতির প্রাকৃতিক চলাচলপথ বা করিডর সংরক্ষণ। হাতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নির্দিষ্ট পথ ব্যবহার করে চলাচল করে। সেই পথ দখল করে বসতি, বাজার, সড়ক কিংবা অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। হাতি করিডর চিহ্নিত করে আইনগত সুরক্ষা দিতে হবে। দখল ও নতুন স্থাপনা বন্ধ করতে হবে। যেসব এলাকায় মানুষের বসতি ও হাতির চলাচলপথ সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা নিরাপদ করতে হবে। হাতির বিচরণ এলাকায় অনিরাপদ তার ও অবৈধ বিদ্যুতায়িত ফাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ক্ষতিপূরণ হতে হবে দ্রুত ও বাস্তবসম্মতঃ হাতির আক্রমণে ফসল, ঘরবাড়ি বা সম্পদের ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণের দীর্ঘসূত্রতা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও কৃষকের জন্য দ্রুত, সহজ ও বাস্তবসম্মত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে হাতি-প্রবণ এলাকায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে হাতির অবস্থান পর্যবেক্ষণ, মোবাইলভিত্তিক সতর্কবার্তা, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল এবং প্রশিক্ষিত দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট গঠন করা জরুরি। বাংলাদেশে হাতি সংরক্ষণকে প্রকল্পনির্ভর সীমিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে রাখা যাবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা। প্রথমত, অবিলম্বে বন্য হাতির নতুন জাতীয় জরিপ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব গুরুত্বপূর্ণ হাতি করিডর চিহ্নিত ও আইনগতভাবে সুরক্ষিত করতে হবে। তৃতীয়ত, চুনতিসহ গুরুত্বপূর্ণ অভয়ারণ্যগুলোতে দখল, বন উজাড় ও অপরিকল্পিত স্থাপনা বন্ধ করতে হবে। চতুর্থত, বৈদ্যুতিক ফাঁদ ও হাতি হত্যার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।পঞ্চমত, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ এবং বিকল্প জীবিকা বা ফসল সুরক্ষা সহায়তা দিতে হবে। ষষ্ঠত, হাতির চলাচলপ্রবণ প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় জনগণকে অংশীদার করে স্থায়ী মানুষ-হাতি সংঘাত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
মানুষের প্রাণ মূল্যবান, হাতির জীবনও প্রকৃতির জন্য মূল্যবান। এই দুই সত্যকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মানুষকে বাঁচাতে হাতি মারতে হবে–এই ধারণা যেমন ভুল, তেমনি মানুষের ক্ষয়ক্ষতিকে উপেক্ষা করে শুধু সংরক্ষণের কথা বলাও বাস্তবসম্মত নয়। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ নিরাপদ থাকবে, কৃষকের ফসল রক্ষা পাবে এবং হাতিও তার স্বাভাবিক আবাস ও চলাচলের পথ ফিরে পাবে। আমরা যদি বনকে কেবল জমি মনে করি, পাহাড়কে কেবল সম্পদ মনে করি এবং হাতিকে কেবল বিপজ্জনক প্রাণী মনে করি, তাহলে প্রকৃতির বিরুদ্ধে আমাদের এই যুদ্ধের শেষ পরিণতি শুভ হবে না। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে। বন ধ্বংস হলে জলবায়ু বদলায়, জীববৈচিত্র্য কমে, খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন–আমরা কি উন্নয়ন চাই, নাকি টেকসই উন্নয়ন চাই? যদি দ্বিতীয়টিই আমাদের লক্ষ্য হয়, তাহলে হাতির আবাস রক্ষা করতে হবে, বনকে বাঁচাতে হবে এবং মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমিয়ে সহাবস্থানের পথ তৈরি করতে হবে। হাতি বাঁচানো মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; হাতি বাঁচানো মানে বনকে রক্ষা করা। আর বনকে রক্ষা করা মানে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। বন বাঁচান, হাতির করিডর রক্ষা করুন, মানুষ-হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করুন–প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়, সহমর্মিতাই হোক আমাদের উন্নয়নের নতুন দর্শন।
লেখক-
শিব্বির আহমেদ রানা
(লেখক ও কলামিস্ট)
বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
ই-মেইল: shibbirahmedctg1990@gmail.com