
একটি প্রেসক্রিপশনের একটি অক্ষর ভুল পড়া, একটি সংখ্যা ভুল বোঝা কিংবা একটি ওষুধের নাম ভুল শনাক্ত করা–ঘটনাটি বাইরে থেকে যতটা তুচ্ছ মনে হয়, একজন রোগীর জীবনে এর পরিণতি ততটাই ভয়াবহ হতে পারে। চিকিৎসকের কাগজে লেখা কয়েকটি অস্পষ্ট শব্দ কখনো ভুল ওষুধের কারণ হতে পারে, কখনো ভুল মাত্রায় ওষুধ সেবনের কারণ হতে পারে, আবার কখনো রোগীর জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অথচ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন হওয়া উচিত রোগীর চিকিৎসার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে এখনো এমন অসংখ্য প্রেসক্রিপশন দেখা যায়, যার লেখা রোগী তো দূরের কথা, অনেক সময় ফার্মেসির কর্মীর কাছেও স্পষ্ট নয়। ফলে রোগ নিরাময়ের প্রথম ধাপেই তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা, বিভ্রান্তি ও ঝুঁকি।প্রশ্ন হচ্ছে, একজন চিকিৎসক নিজের লেখা বুঝতে পারছেন–এটাই কি যথেষ্ট? নিশ্চয়ই নয়। প্রেসক্রিপশন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত নোট নয়; এটি রোগীর চিকিৎসা-নির্দেশনা। রোগীকে কোন ওষুধ খেতে হবে, কত মিলিগ্রাম বা কত মাত্রায় খেতে হবে, দিনে কয়বার খেতে হবে, খাবারের আগে না পরে খেতে হবে এবং কতদিন চালিয়ে যেতে হবে–এসব তথ্য এমনভাবে লেখা থাকা প্রয়োজন, যাতে রোগী, তার স্বজন, ফার্মেসির কর্মী কিংবা প্রয়োজনে অন্য চিকিৎসকও তা সহজে বুঝতে পারেন। চিকিৎসকের কাছে পরিষ্কার কিন্তু রোগীর কাছে অস্পষ্ট–এমন প্রেসক্রিপশনকে নিরাপদ প্রেসক্রিপশন বলা যায় না।
আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের বাস্তবতা এ সমস্যাকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ উচ্চশিক্ষিত নন। অনেকেই পড়তে জানলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইংরেজি নাম, সংক্ষিপ্ত শব্দ কিংবা চিকিৎসকের দ্রুত লেখা হাতের অক্ষর বোঝার সক্ষমতা রাখেন না। ফলে তারা প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে সরাসরি ফার্মেসিতে যান এবং চিকিৎসকের লিখিত নির্দেশনার পরিবর্তে বিক্রেতার ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। সেখানে প্রেসক্রিপশন অস্পষ্ট হলে ভুল ওষুধ বেছে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে একই রকম দেখতে বা উচ্চারণে কাছাকাছি নামের ওষুধের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও ভয়াবহ হতে পারে। এখানে দায় কেবল ফার্মেসির নয়, আবার কেবল চিকিৎসকেরও নয়। এটি একটি সমন্বিত রোগী-নিরাপত্তার প্রশ্ন। চিকিৎসক যদি অস্পষ্টভাবে লেখেন, ফার্মেসি যদি অনুমান করে ওষুধ দেয় এবং রোগী যদি না বুঝেই তা সেবন করেন–তাহলে তিনটি স্তরেই ভুলের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই ভুল ওষুধের ঘটনা ঘটার পর শুধু ফার্মেসিকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না। ভুল প্রতিরোধ করতে হলে প্রেসক্রিপশন লেখার জায়গা থেকেই নিরাপত্তার ব্যবস্থা শুরু করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ওষুধ ব্যবহারের বিভিন্ন ধাপে ভুলের কারণে রোগীর ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আসছে। ওষুধ নির্ধারণ, সরবরাহ ও সেবনের প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ ওষুধ রোগ সারানোর উপকরণ হলেও ভুলভাবে ব্যবহৃত হলে সেটিই ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফলে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের পাঠযোগ্যতা নিছক সৌন্দর্য বা শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি ‘মেডিকেশন সেফটি’র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বাস্তবতায় কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা ই-প্রেসক্রিপশনের ব্যবহার সময়ের দাবি। হাতে লেখা প্রেসক্রিপশনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো পাঠযোগ্যতা। কম্পিউটারে টাইপ করা প্রেসক্রিপশন সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন সংরক্ষণ, পরবর্তী চিকিৎসায় ব্যবহার এবং চিকিৎসার ইতিহাস অনুসরণ করাও সহজ করে। তবে শুধু কম্পিউটারে লেখা হলেই প্রেসক্রিপশন নিরাপদ হয়ে যাবে না। ভুল ওষুধের নাম, ভুল ডোজ বা ভুল নির্দেশনা কম্পিউটারেও লেখা সম্ভব। তাই প্রযুক্তির সঙ্গে প্রয়োজন চিকিৎসকের সতর্কতা, তথ্য যাচাই এবং একটি মানসম্মত প্রেসক্রিপশন কাঠামো।
প্রশ্ন উঠতে পারে–বাংলাদেশে কি প্রেসক্রিপশন লেখার কোনো নীতিমালা নেই? বাস্তবে চিকিৎসকদের পেশাগত আচরণ ও দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নীতিমালা রয়েছে। টেলিমেডিসিনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশন প্রদানের বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সমস্যা মূলত বাস্তবায়ন ও অভিন্ন মানদণ্ডে। প্রেসক্রিপশন কতটা পাঠযোগ্য হবে, কোন কোন তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে থাকবে, ওষুধের নাম ও ডোজ কীভাবে লেখা হবে, রোগীকে ব্যবহারের নির্দেশনা কীভাবে দেওয়া হবে–এসব বিষয়ে আরও স্পষ্ট, যুগোপযোগী ও প্রয়োগযোগ্য মানদণ্ড প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল এবং সংশ্লিষ্ট ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি জাতীয় প্রেসক্রিপশন স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে রোগীর বয়স, রোগ নির্ণয়, ওষুধের নাম, শক্তিমাত্রা, ডোজ, ব্যবহারের পদ্ধতি, দিনে কতবার, কতদিন এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা–সবকিছুর জন্য নির্দিষ্ট কাঠামো থাকতে পারে। যেখানে প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত সুবিধা রয়েছে, সেখানে ধাপে ধাপে ই-প্রেসক্রিপশন চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আর হাতে লেখা প্রেসক্রিপশনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও পাঠযোগ্য লেখাকে পেশাগত বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা প্রয়োজন।একই সঙ্গে ফার্মেসিগুলোর জন্যও কঠোর নির্দেশনা থাকা দরকার। কোনো প্রেসক্রিপশনের লেখা অস্পষ্ট হলে অনুমান করে ওষুধ বিক্রি করা যাবে না। প্রয়োজনে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওষুধের নাম, মাত্রা ও নির্দেশনা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একজন ফার্মেসি কর্মীর ‘মনে হয় এই ওষুধটাই লেখা হয়েছে’–এমন ধারণা রোগীর চিকিৎসার ভিত্তি হতে পারে না। ওষুধ বিক্রি একটি দায়িত্বশীল কাজ; এখানে অনুমানের কোনো স্থান নেই।
চিকিৎসকদের প্রতিও বিনীত অনুরোধ–রোগীর সময়ের কথা ভাবুন, রোগীর শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা ভাবুন, নিজের হাতের লেখা সম্পর্কে বাস্তব মূল্যায়ন করুন। আপনার কাছে যে লেখা পরিষ্কার, সেটি অন্যের কাছে অস্পষ্ট হতে পারে। প্রতিদিন শত শত রোগী দেখার চাপ বাস্তবতা; কিন্তু সেই চাপের কারণে রোগীর নিরাপত্তা বিসর্জন দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চিকিৎসা শুধু রোগ নির্ণয় ও ওষুধ লিখে দেওয়ার নাম নয়; রোগী যেন সেই চিকিৎসা সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারেন, সেটিও চিকিৎসারই অংশ। প্রেসক্রিপশন নিয়ে আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে রসিকতা চলে আসছে–‘ডাক্তারের লেখা ডাক্তার ছাড়া কেউ বোঝে না।’ কথাটি হয়তো হাসির, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা মোটেই হাসির নয়। চিকিৎসকের হাতের লেখা নিয়ে কৌতুক করার সংস্কৃতি বদলে এখন রোগীর নিরাপত্তার প্রশ্নটি সামনে আনা দরকার। একটি প্রেসক্রিপশন এমন হওয়া উচিত নয়, যার অর্থ উদ্ধার করতে রোগীকে ফার্মেসিতে গিয়ে ‘অনুবাদ’ করাতে হবে। সবশেষে কথা একটাই–চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন কোনো দুর্বোধ্য সাংকেতিক ভাষা হতে পারে না। এটি হতে হবে রোগীর জন্য স্পষ্ট, ফার্মেসির জন্য নির্ভুল এবং পরবর্তী চিকিৎসকের জন্য বোধগম্য একটি দায়িত্বশীল চিকিৎসা-নথি। চিকিৎসক স্পষ্ট করে লিখবেন, সম্ভব হলে কম্পিউটার বা ই-প্রেসক্রিপশন ব্যবহার করবেন; ফার্মেসি অস্পষ্ট প্রেসক্রিপশনে অনুমান করবে না; আর সরকার একটি অভিন্ন ও কার্যকর প্রেসক্রিপশন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে–এটাই হওয়া উচিত স্বাভাবিক ব্যবস্থা। কারণ ভুল প্রেসক্রিপশন শুধু একটি ভুল লেখা নয়; এটি ভুল চিকিৎসার দরজা খুলে দিতে পারে। যে কাগজে রোগীর সুস্থ হওয়ার পথনির্দেশ থাকার কথা, সেই কাগজ যদি রোগীর জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করে, তবে সেখানে পরিবর্তন আর ঐচ্ছিক নয়–অপরিহার্য। মানুষের জীবন নিয়ে লেখা প্রেসক্রিপশনে অস্পষ্টতার কোনো অজুহাত থাকতে পারে না।
লেখক-
শিব্বির আহমেদ রানা
(লেখক-কলামিস্ট)
বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
ই-মেইল: shibbirahmedctg1990@gmail.com