মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
হারিয়ে যেতে বসেছে বাঁশখালীর মৃৎশিল্প বাঁশখালীতে হাসিনার নামে মাইকিংয়ের ঘটনায় জড়িতদের খুঁজছে পুলিশ, জব্দ অটোরিকশা জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও প্রতিকূলতা মোকাবিলায় অভিবাসন নিয়ে বাঁশখালীতে রামরু’র আলোচনা পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে বাঁশখালীতে অভিযান, একজনকে কারাগারে পাঠালেন এসি-ল্যান্ড বাঁশখালী ইকোপার্কের স্বচ্ছ লেক ঢেকেছে টোপাপানা ও জলজ ঘাসে, হারাচ্ছে পর্যটক বাঁশখালীতে নিখোঁজের ১৩ দিনেও সন্ধান মেলেনি মাদরাসাছাত্রী সুমাইয়ার, উৎকণ্ঠায় পরিবার বাঁশখালী প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে ১১ পদের ৬টিই শূন্য, ব্যাহত সেবা বায়েজিদে নাগরিক সোসাইটির ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত বাঁশখালীতে সবজি ক্ষেতের জালে আটকা বিষধর পদ্ম গোখরা, বনে অবমুক্ত বাঁশখালীতে অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, জব্দ ড্রেজার পাইপ ও এক্সকাভেটর

হারিয়ে যেতে বসেছে বাঁশখালীর মৃৎশিল্প

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

বাঁশখালীর কুমারপাড়ায় এখনো ঘোরে মাটির চাকা। সেই চাকায় মাটি বসিয়ে তৈরি হয় হাঁড়ি, পাতিল, কলস, সরা, মালসা ও নানা ধরনের মৃৎপণ্য। চুল্লিতে আগুন জ্বলে, মাটির তৈরি সামগ্রী শক্ত হয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, শত বছরের পুরোনো এই শিল্প এখনো আগের মতোই জীবন্ত। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। চাকা ঘুরলেও ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে একটি ঐতিহ্যবাহী পেশার অর্থনৈতিক জীবন।

সাধনপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ও উত্তর সাধনপুরের রৌদ্রপাড়া, কালীপুর ইউনিয়নের কুমারপাড়া, বাঁশখালী পৌরসভার পূর্বাংশ, পুকুরিয়া ও চাম্বলের কিছু এলাকায় এখনো বহু পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে দক্ষিণ সাধনপুরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবার বংশপরম্পরায় এই পেশা ধরে রেখেছে। কথিত আছে, বাঁশখালীতে মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য দুই থেকে আড়াই শত বছরের পুরোনো। অর্থাৎ এটি শুধু একটি পেশা নয়; স্থানীয় সংস্কৃতি ও লোকজ জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একসময় গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মাটির পাত্রের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। রান্নাঘরে মাটির হাঁড়ি-পাতিল, পানি রাখার জন্য কলস, খাবার ঢাকার জন্য সরা—সবই ছিল সাধারণ ব্যবহার্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, প্লাস্টিক ও মেলামাইনের ব্যবহার বাড়ায় মাটির পণ্যের ঐতিহ্যবাহী বাজার সংকুচিত হয়েছে।

তবে মৃৎশিল্পের সম্ভাবনা যে শেষ হয়ে গেছে, তা নয়। বরং বদলে গেছে এর বাজার। আধুনিক হোটেল-রেস্তোরাঁয় মাটির পাত্রে খাবার পরিবেশন, ঘর সাজাতে টেরাকোটা, ফুলের টব, শোপিস, ওয়াল ডেকোরেশন, কাপ-প্লেট ও মগের ব্যবহার বাড়ছে। পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবেও মাটির সামগ্রীর নতুন চাহিদা তৈরি হয়েছে। শহুরে মানুষের রুচিতে ঐতিহ্য ও নান্দনিকতার মিশ্রণ ঘটিয়ে মৃৎশিল্পের জন্য নতুন বাজার তৈরি করা সম্ভব।

বাঁশখালীর সমস্যা এখানেই–সম্ভাবনা থাকলেও সেই সম্ভাবনার বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা তৈরি হয়নি। এখানকার অধিকাংশ কারিগর এখনো পুরোনো পদ্ধতিতে মৃৎপণ্য তৈরি করেন। মাটি সংগ্রহ, পরিষ্কার করা, পানি দিয়ে নরম করা, পিটিয়ে প্রস্তুত করা, পুরোনো চাকায় বসিয়ে আকৃতি দেওয়া, রোদে শুকানো এবং কাঠ, খড় বা লাকড়ির চুল্লিতে পোড়ানো–পুরো প্রক্রিয়াই শ্রমনির্ভর। এতে সময় বেশি লাগে, উৎপাদন কম হয় এবং আধুনিক বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী একই মান ও নকশার পণ্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেখানে মোটরচালিত চাকা, উন্নত কিলন, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় পোড়ানোর প্রযুক্তি, মাটি পরিশোধনের যন্ত্র এবং আধুনিক গ্লেজ ও রঙ ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে বাঁশখালীর কারিগরদের বড় অংশ এখনো প্রযুক্তির বাইরে। ফলে তারা একই সঙ্গে উৎপাদন, মান ও বাজার—তিন দিক থেকেই পিছিয়ে পড়ছেন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আধুনিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ পাওয়া কারিগরের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। স্থানীয় উদ্যোগে কয়েকজনকে আধুনিক মৃৎশিল্পের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণের পর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও পুঁজি না থাকায় সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়নি।

এখানেই আমাদের প্রশিক্ষণকেন্দ্রিক উন্নয়ন ভাবনার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। প্রশিক্ষণ একটি প্রক্রিয়ার শুরু, শেষ নয়। প্রশিক্ষণের পর যদি পুঁজি, যন্ত্রপাতি, উৎপাদন সহায়তা ও বাজার না থাকে, তাহলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষটি বাস্তবে উদ্যোক্তা হতে পারবেন না।

মৃৎশিল্পের আরেকটি বড় সংকট উৎপাদন ব্যয়। ভালো মানের মাটি সংগ্রহ ও পরিবহন, লাকড়ি ও অন্যান্য জ্বালানি, চুল্লি তৈরি, পণ্য শুকানোর জায়গা—সবকিছুর জন্য অর্থ প্রয়োজন। বর্ষাকালে শুকানোর সমস্যা আরও বাড়ে। অথচ উৎপাদিত পণ্যের বাজারমূল্য অনেক ক্ষেত্রে সেই ব্যয় ও শ্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ফলে একটি অদ্ভুত অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়েছে। কম পুঁজির কারণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাচ্ছে না; প্রযুক্তির অভাবে উৎপাদন ও মান বাড়ছে না; মান ও বৈচিত্র্য না বাড়ায় ভালো বাজার তৈরি হচ্ছে না; আর কম আয় হওয়ায় আবার নতুন করে বিনিয়োগের পুঁজিও জমছে না।

এই চক্র ভাঙতে না পারলে মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। সবচেয়ে বড় বিপদ নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ। দীর্ঘ শ্রমের তুলনায় কম আয়, অনিশ্চিত বাজার এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে কুমার পরিবারের সন্তানরা বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকছে। এটি স্বাভাবিক। কোনো পেশাকে শুধু ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাখা যায় না। পেশাটিকে মর্যাদাপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় করে তুলতে হয়। এ কারণে এখন মৃৎশিল্পকে শুধুই ‘ঐতিহ্য’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে ক্ষুদ্র শিল্প ও উদ্যোক্তা খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

প্রথম প্রয়োজন সহজ শর্তে অর্থায়ন। কারিগরদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণের পাশাপাশি আধুনিক চাকা, কিলন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনায় সহায়তা দরকার। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণের ধরন বদলাতে হবে। শুধু মাটির পাত্র বানানোর প্রশিক্ষণ নয়–আধুনিক নকশা, রঙ, গ্লেজ, প্যাকেজিং, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজারজাতকরণ শেখাতে হবে। তৃতীয়ত, উৎপাদিত পণ্যের বাজার নিশ্চিত করতে হবে।

কুমারপাড়াগুলোকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র ‘মৃৎশিল্প পল্লি’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সেখানে প্রশিক্ষণ, উৎপাদন, কাঁচামাল সংরক্ষণ, আধুনিক চুল্লি, প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র থাকবে। সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে একক কারিগরের ওপর বিনিয়োগের চাপ কমবে এবং বড় পরিসরে পণ্য উৎপাদন সম্ভব হবে।

বিপণনের ক্ষেত্রেও নতুন চিন্তা প্রয়োজন। স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভর করে এই শিল্পকে বড় করা সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম শহরসহ দেশের বিভিন্ন শহরের রেস্তোরাঁ, হোটেল, পর্যটনকেন্দ্র ও ঘরসজ্জার বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে হবে। অনলাইন বিপণনও হতে পারে নতুন সম্ভাবনার দরজা।

বাঁশখালীর পর্যটন সম্ভাবনাকেও এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়। স্থানীয়ভাবে তৈরি মাটির পণ্যকে বাঁশখালীর নিজস্ব পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে পর্যটকদের জন্য স্মারকপণ্য হিসেবে বাজারজাত করা সম্ভব। এতে একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্প, সংস্কৃতি ও পর্যটন অর্থনীতি উপকৃত হতে পারে।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসন, যুব উন্নয়ন, সমবায় বিভাগ, এনজিও এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কারিগরদের খুঁজে বের করে একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি করা, তাদের দক্ষতা ও প্রয়োজন চিহ্নিত করা এবং প্রশিক্ষণ থেকে বাজার পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ সহায়তা কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

কারণ মৃৎশিল্পকে বাঁচানোর অর্থ শুধু মাটির হাঁড়ি-পাতিল বাঁচানো নয়। এর সঙ্গে বাঁচবে একটি অঞ্চলের লোকজ জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা, সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং বহু প্রজন্মের জীবনযাত্রার ইতিহাস। বাঁশখালীর কুমারপাড়ায় এখনো মাটির চাকা ঘোরে। কিন্তু এই চাকা কতদিন ঘুরবে, তা নির্ভর করছে আমরা এখন কী উদ্যোগ নিই তার ওপর। আজ যদি শুধু ঐতিহ্য হারানোর আক্ষেপ করি, আগামী দিনে হয়তো কুমারপাড়ায় চাকা থাকবে, কিন্তু ঘোরানোর মানুষ থাকবে না।

তাই মৃৎশিল্প সংরক্ষণের নামে কেবল প্রদর্শনী বা স্মারক আয়োজন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জীবিকার নিশ্চয়তা। প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি। প্রয়োজন পুঁজি। প্রয়োজন বাজার। মাটির শিল্পকে মিউজিয়ামের স্মৃতি নয়, জীবন্ত অর্থনীতির অংশ করে তুলতে হবে। তাহলেই বাঁশখালীর কুমারপাড়ায় মাটির চাকা আবার শুধু ঐতিহ্যের প্রতীক হবে না–হয়ে উঠবে নতুন কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনার চাকা। মাটির শিল্প হারিয়ে যাওয়ার আগে মাটির মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সময় এখনই।

 

শিব্বির আহমেদ রানা

লেখক-কলামিস্ট

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১
২৩৪৫৬৭৮
৯১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews