
বাংলাদেশের ধর্মীয়শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কওমী মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা। দীর্ঘ ঐতিহ্য, ত্যাগ ও স্বাতন্ত্র্যের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই ধারাটি একসময় ছিল পরিবর্তনের প্রতি সতর্ক, কখনো কখনো কঠোরও। কিন্তু সময়ের প্রবাহে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে কওমী অঙ্গন যে আত্মসমালোচনা ও রূপান্তরের পথে হাঁটছে, তা নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।
একসময় কওমী শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রীয় সনদের আওতায় পরীক্ষা দিলে তা আদর্শচ্যুতি হিসেবে বিবেচিত হতো। সরকারি আলিয়া বোর্ডের দাখিল, আলিম বা ফাযিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মানেই ছিল শাস্তির ঝুঁকি, এমনকি বহিস্কারও করা হতো। দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সংযোগকে তখন সন্দেহের চোখে দেখা হতো। অথচ সময়ের পরিক্রমায় কওমী অঙ্গন নিজ উদ্যোগে দাওরায়ে হাদিসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ে সোচ্চার হয় এবং সফলতাও অর্জন করে। এই পরিবর্তন প্রমাণ করে—বাস্তবতা কখনও স্থির থাকে না; প্রেক্ষাপট বদলালে দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হয়।
একইভাবে ভাষা ও জ্ঞানচর্চার প্রশ্নেও ছিল দ্বিধা ও সংশয়। ইংরেজি ভাষাকে একসময় পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বাহক হিসেবে দেখিয়ে তা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু আজ বৈশ্বিক দাওয়াহ, উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে রেখে ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নূরানী স্তর থেকেই ইংরেজি শেখানো হচ্ছে, স্পোকেন ইংলিশ ও গ্রামার চর্চা চালু হয়েছে, অনেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিতে ভাষাগত দক্ষতা অর্জনে সচেষ্ট। এই পরিবর্তন কোনো আদর্শবিরোধিতা নয়; বরং আদর্শকে যুগোপযোগীভাবে উপস্থাপনের প্রজ্ঞা।
একসময় গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস কিংবা ভূগোলকে ‘দুনিয়াবি’ তকমা দিয়ে পাঠ্যক্রমের বাইরে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর। সমাজে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে মৌলিক বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা অপরিহার্য। ফলে কওমী অঙ্গনেও ধীরে ধীরে কম্পিউটার শিক্ষা, অনলাইন রিসোর্স, ডিজিটাল লাইব্রেরি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার চর্চা শুরু হয়েছে। অনেক মাদরাসায় এখন ওয়েবসাইট, অনলাইন ক্লাস এবং গবেষণামূলক কাজের উদ্যোগ দেখা যায়। এটি কেবল প্রযুক্তি গ্রহণ নয়; এটি জ্ঞানের পরিসর বিস্তারের স্বীকৃতি।
প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ছিল কঠোরতা। ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ কিংবা ক্যামেরার ব্যবহারকে একসময় নিষিদ্ধ বা অনুচিত বলা হতো। কিন্তু আজ সেই প্রযুক্তিই দাওয়াহ কার্যক্রমের প্রধান মাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরআন-হাদিসের দরস, সমসাময়িক বিষয়ে আলেমদের বিশ্লেষণ এবং নৈতিক শিক্ষার বার্তা লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন এক বিশাল মিম্বর। সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে এটি দ্বীনের প্রচারে এক শক্তিশালী হাতিয়ার।
নারী শিক্ষার প্রশ্নেও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন লক্ষণীয়। একসময় নারীদের জন্য উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল। আজ কওমী অঙ্গনে নারী মাদরাসা, হিফজখানা এবং দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত চালু হয়েছে। নারী আলেমরা পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ধর্মীয় সচেতনতা, নৈতিকতা ও সামাজিক সংস্কারে তাঁদের অবদান ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। এটি ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ—জ্ঞান অর্জন নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই অপরিহার্য।
এই ধারাবাহিক পরিবর্তনগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়: সমস্যা কখনও দ্বীনের মৌলিক আদর্শে ছিল না; সমস্যা ছিল আমাদের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে। ইসলাম জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ভারসাম্যের ধর্ম। সময়, স্থান ও পরিস্থিতির আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এটিই ইসলামী চিন্তার প্রাণশক্তি। অতএব কোনো নতুন বাস্তবতা সামনে এলে তা যাচাই-বাছাই না করে ‘হারাম’ বা ‘অগ্রহণযোগ্য’ তকমা দেওয়া আত্মরক্ষার সহজ পথ হতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে অগ্রগতির অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
তবে পরিবর্তন মানেই শিকড় বিস্মৃত হওয়া নয়। কওমী শিক্ষাব্যবস্থার শক্তি হলো তার গভীর পাঠচর্চা, ত্যাগী আলেম সমাজ এবং কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জ্ঞানের ধারাবাহিকতা। এই ভিত্তি অটুট রেখেই আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে সমন্বয় ঘটাতে হবে। একদিকে দ্বীনি মাকাসিদ ও আকীদার স্বচ্ছতা, অন্যদিকে সমসাময়িক জ্ঞানের প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবহার—এই সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের পথরেখা।
আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনার সাহস। অতীতে যেসব বিষয়ে অতি কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে আরও বিচক্ষণ হতে হবে। বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক যোগাযোগ, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে কওমী শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন তারা মসজিদের মিম্বরেও দক্ষ, আবার সমাজের বৃহত্তর পরিসরেও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
কওমী শিক্ষাধারার সামনে তাই দ্বৈত দায়িত্ব—একদিকে ঐতিহ্য সংরক্ষণ, অন্যদিকে সময়োপযোগী রূপান্তর। পরিবর্তনের এই যাত্রা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে; এখন প্রয়োজন সুপরিকল্পিত নীতি, সমন্বিত পাঠ্যক্রম এবং উন্মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ। মতভিন্নতাকে দমন নয়, বরং সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খোঁজা—এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে কওমী অঙ্গন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
সময়ের আয়নায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, যে ধারাকে একসময় পরিবর্তনবিমুখ বলা হতো, সেই ধারাই আজ বাস্তবতার প্রয়োজনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে সংকীর্ণতার পরিবর্তে প্রজ্ঞা, প্রতিক্রিয়ার বদলে পর্যালোচনা এবং অস্বীকারের পরিবর্তে দায়িত্বশীল গ্রহণ—এই মানসিকতাই হতে হবে পথনির্দেশক। দ্বীনের মৌলিক আদর্শ অটুট রেখে জ্ঞান ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে এগিয়ে যাওয়াই কওমী শিক্ষাধারার টিকে থাকার একমাত্র টেকসই পথ।
লেখক-
শিব্বির আহমেদ রানা
গণমাধ্যমকর্মী ও কলাম লেখক
বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
ই-মেইল: shibbirahmedctg1990@gmail.com