1. news@banshkhalisanglap.com : বাঁশখালী সংলাপ : বাঁশখালী সংলাপ
  2. info@www.banshkhalisanglap.com : বাঁশখালী সংলাপ :
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:৪১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

মানবতার মানদণ্ড: তখন ও এখন

  • প্রকাশিত: শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

 

মানবতা কোনো হালকা শব্দ নয়। এটি দায়িত্ব, ত্যাগ ও নিঃস্বার্থতার এক দীর্ঘ সাধনার নাম। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ শব্দবন্ধটি এমনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেন দু-একটি আনুষ্ঠানিক দান বা দায়িত্বপালনই মানবতার চূড়ান্ত মাপকাঠি। এই প্রবণতা শুধু শব্দের অপব্যবহার নয়, বরং ইতিহাস, মূল্যবোধ ও প্রকৃত মানবতাবাদীদের প্রতি এক ধরনের অবমাননাও বটে।

বাংলার ইতিহাসে দানশীলতা ও মানবকল্যাণের প্রতীক হিসেবে হাজী মুহাম্মদ মুহসীনের নাম অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। ১৭৭০ সালের ভয়াবহ মন্বন্তরের সময় তিনি নিজ অর্থভাণ্ডার খুলে দিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। স্থাপন করেন একের পর এক লঙ্গরখানা। তাঁর এই দানশীলতা তখনই কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। এমনকি বিশ্বখ্যাত আরবি কবি শেখ সাদিও তাঁর লেখনীতে মুহসীনের দানবীরতার কথা উল্লেখ করেছেন। ইতিহাস তাঁকে চেনে ‘বাংলার হাতেম তাই’ নামে।

হাজী মুহাম্মদ মুহসীন শুধু দান করেই ক্ষান্ত হননি; তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মানবকল্যাণকে টেকসই রূপ দিতে ‘মুহসীন ফান্ড’ গঠন করেন। জীবদ্দশাতেই নির্ধারণ করে যান- এই অর্থ ব্যয় হবে শিক্ষা, জনকল্যাণ, দাতব্য চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, অবসরভাতা ও ধর্মীয় শিক্ষায়। তাঁর ট্রাস্টের অর্থে গড়ে ওঠে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দাতব্য চিকিৎসালয়। হুগলি মুহসীন কলেজ- ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল তাঁর মানবিক দর্শনের এক বাস্তব উদাহরণ। এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দিজেন্দ্রলাল রায়, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো মনীষীরা বাংলার সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় অসামান্য অবদান রেখেছেন।

নিজের, বোনের ও ভগ্নিপতির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিসহ সবকিছু মানবকল্যাণে বিলিয়ে দেওয়া এই মানুষটি নিঃসন্দেহে দানবীর। আধুনিক ভাষায় বললে- তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আমরা প্রায়ই দেখি ভিন্ন চিত্র। টেন্ডারবাজি, পরসম্পদ আত্মসাৎ, সরকারি মালামাল লুট, রাজস্ব ফাঁকি কিংবা সরকারি বাজেট লুট করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া ব্যক্তিরাও নামমাত্র কিছু দান করে ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ হিসেবে প্রচারিত হচ্ছেন। আরও উদ্বেগজনক হলো- তাদের অনুসারীরাও এই ভারী শব্দটি নির্বিচারে ব্যবহার করছেন।

একজন জনপ্রতিনিধি বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির পক্ষে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে জনসেবা দেওয়া কোনো বদান্যতা নয়; এটি তাঁর নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। এই সেবা আসে জনগণের করের টাকায়। সুতরাং দায়িত্ব পালন করলেই তাকে মানবতার ফেরিওয়ালা আখ্যা দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। দু-একটি কাজ, কিংবা সীমিত পরিসরের দান-তা মানবিক কাজ হতে পারে, কিন্তু মানবতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড নয়। একজনকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিয়ে অন্যজনকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া মানবতা হতে পারে না। সরকারি বাজেটের একটি নলকূপ জনস্বার্থে স্থাপন করে বাকিগুলো আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বসানোও মানবতার উদাহরণ নয়। স্বার্থনির্ভর ‘গিভ অ্যান্ড টেক’-এর খেলায় মানবতার সংজ্ঞা আরোপ করা যায় না। মানবতা জন্ম নেয় নিঃস্বার্থতা, আত্মনিবেদন ও ধারাবাহিক ত্যাগ থেকে।
অতএব প্রশ্ন থেকেই যায়- যখন তখন, যাকে তাকে ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ বা ‘হাতেম তাই’ বলা কি প্রকৃত ‘বাংলার হাতেম তাই’-এর প্রতি অবিচার নয়?
তবুও বলা প্রয়োজন, প্রতিটি মানবিক কাজ যত ছোটই হোক- সম্মানযোগ্য এবং তা সমাজে টিকে থাকুক। কিন্তু শব্দের অপব্যবহার করে প্রকৃত মানবতাবাদীদের অবমূল্যায়ন করা থেকে আমাদের সংযত হওয়া জরুরি। মানবতা বড় দায়, আর ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ তা আরও বড় দায়িত্ব।

শিব্বির আহমেদ রানা
গণমাধ্যমকর্মী ও কলাম লেখক
ই-মেইল: shibbirahmedctg1990@gmail.com

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট