1. news@banshkhalisanglap.com : বাঁশখালী সংলাপ : বাঁশখালী সংলাপ
  2. info@www.banshkhalisanglap.com : বাঁশখালী সংলাপ :
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ভয়াল ২৯ এপ্রিল: মৃত্যুর মিছিল দেখেছিল উপকূল, কাঁদে আজও বাঁশখালী পুঁইছড়িতে অবৈধ বালু উত্তোলনের দায়ে যুবককে এক লাখ টাকা জরিমানা সরকারি খরচে বিরোধ নিষ্পত্তির বার্তা নিয়ে বাঁশখালীতে আইনগত সহায়তা দিবস পালিত বাঁশখালীতে অবৈধ ইটভাটায় মোবাইল কোর্ট অভিযান, ২ লাখ টাকা জরিমানা মব সৃষ্টি ও বসতঘরে হামলার অভিযোগ: নিরাপত্তা চেয়ে আদালতের শরণাপন্ন বাঁশখালী আইনজীবী সমিতির নতুন কমিটির অভিষেক সম্পন্ন শিশুদের নেতৃত্বের পাঠশালা স্কাউটিং–বাঁশখালীতে ক্যাম্পুরীর সমাপ্তি অনুষ্ঠানে এমপি জহিরুল ইসলাম নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাটি কাটা, লুকিয়ে রাখা এক্সক্যাভেটর জব্দসহ অর্ধলক্ষ জরিমানা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মাতলামি: জনশান্তি ভঙ্গের দায়ে বাঁশখালীতে যুবকের কারাদণ্ড সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দাখিলা জালিয়াতি: বাঁশখালীতে প্রতারকের জেল, লাখ টাকা জরিমানা

ভয়াল ২৯ এপ্রিল: মৃত্যুর মিছিল দেখেছিল উপকূল, কাঁদে আজও বাঁশখালী

  • প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

শিব্বির আহমদ রানা:: আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল। বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদের ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় দিন। ১৯৯১ সালের এই দিনে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে তছনছ হয়ে গিয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল। মৃত্যু, আর্তনাদ আর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল চট্টগ্রাম উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা। সেই ভয়াল স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় বাঁশখালী উপকূলের মানুষকে।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল গভীর রাতে বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় মুহূর্তেই গ্রাস করেছিল উপকূলীয় জনপদ। প্রবল বাতাসের সঙ্গে কয়েক মিটার উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস ভেঙে দিয়েছিল হাজারো ঘরবাড়ি, উপড়ে ফেলেছিল গাছপালা, ভাসিয়ে নিয়েছিল মানুষ ও গবাদিপশু। ঘুমন্ত মানুষ বুঝে ওঠার আগেই পড়ে মৃত্যুর মুখে। লাশের পর লাশ ছড়িয়ে ছিল চারদিকে। নদী-নালা, খাল-বিল, ডোবা আর সাগরের পানিতে ভেসেছিল মানুষের মরদেহ। গবাদিপশুর মৃতদেহের স্তুপ আর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জনপদ যেন এক বিভীষিকাময় মৃত্যুনগরীতে রূপ নিয়েছিল।

সরকারি হিসাবে ওই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারান ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪২ জন। বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। মারা যায় প্রায় ২০ লাখ গবাদিপশু। গৃহহারা হয় লাখো মানুষ। ধ্বংস হয় কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ। বিশ্ববাসী হতবাক হয়ে দেখেছিল প্রকৃতির সেই নির্মম তাণ্ডব। শোক আর স্তব্ধতায় ডুবে গিয়েছিল পুরো দেশ। উপকূলের অন্যান্য এলাকার মতো বাঁশখালীও ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনপদগুলোর একটি। বিশেষ করে উপজেলার সরল, গণ্ডামারা, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, ছনুয়া, প্রেমাশিয়া, কদমরসুল ও আশপাশের এলাকায় অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান। স্থানীয়দের দাবি, শুধু বাঁশখালীতেই মারা গিয়েছিলেন প্রায় ১২ হাজার মানুষ। অনেক পরিবার আজও খুঁজে পায়নি তাদের স্বজনদের কবর। কারও বাবা, কারও মা, কারও সন্তান কিংবা পুরো পরিবার হারিয়ে যাওয়ার সেই বেদনা এখনও বহন করে চলেছেন উপকূলবাসী।

প্রবীণদের ভাষ্য, সেদিনের আকাশ ছিল অস্বাভাবিক অন্ধকার। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের গতি ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। পরে জলোচ্ছ্বাসের বিশাল ঢেউ লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। কোথাও গাছের ডালে, কোথাও ঘরের চালায় আশ্রয় নিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন মানুষ। কিন্তু সবাই ফিরতে পারেননি জীবনের তীরে। ইতিহাসের ভয়াবহতম প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম হিসেবে বিবেচিত। ৩৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ক্ষত আজও শুকায়নি। ঘরবাড়ি হারানো বহু মানুষ এখনও স্থায়ী নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে পারেননি। উপকূলজুড়ে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিও রয়ে গেছে অপূর্ণ। বর্ষা এলেই জোয়ারের ঢেউ ও অতিবৃষ্টিতে আতঙ্কে থাকেন উপকূলের মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত টুকরো টুকরো বেড়িবাঁধ জোয়ার ও সাগরের ঢেউয়ে ঝুঁকির মুখে পড়ে। ফলে প্রতি বর্ষায় নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় উপকূলবাসীকে। এখনও প্রেমাশিয়া, খানখানাবাদ, সরল, বাহারছড়া, ইলশা, গণ্ডামারা-বড়ঘোনা, শেখেরখীল, চাম্বলের বাংলাবাজার ও ছনুয়াসহ নিম্নাঞ্চলের মানুষ দুর্যোগ মৌসুমে চরম উদ্বেগে থাকেন। এপ্রিলের শেষ প্রান্তে সাগর উত্তাল হলেই ফিরে আসে সেই আতঙ্কের রাতের স্মৃতি।

যে স্মৃতি আজও কাঁদায়ঃ ছনুয়া উপকূলের বাসিন্দা সাংবাদিক মহিবুল্লাহ ছানবী বলেন, ‘প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও রাক্ষুসে জলোচ্ছ্বাসে আমার বাবাসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্য শাহাদাত বরণ করেন। সেই দুঃসহ স্মৃতি বুকে ধারণ করে আজও দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে নীরবে কেঁদে চলেছি।’ তিনি বলেন, ‘সাগরের দিকে তাকালেই হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের কথা মনে পড়ে। চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে। সেই ভয়াল রাতে বাড়ির আঙিনায় পরিবারের ছয়জন সদস্যের মরদেহ খুঁজে পেলেও বাবা, মা, ভাই, ভাবি, ভাগিনা ও ভাতিজাসহ আরও ১২ জনের মরদেহ আর কখনো খুঁজে পাইনি।’ মহিবুল্লাহ ছানবী জানান, ঘূর্ণিঝড়ের রাতে পরিবারের সবাই মাটির দেয়াল ও ছনের ছাউনির ঘরে অবস্থান করছিলেন। রাত প্রায় ১২টার দিকে সাগরের উত্তাল পানি ফুঁসে উঠলে সবাই ঘরের চালের ওপর আশ্রয় নেন। কিন্তু প্রবল জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ের তাণ্ডবে মুহূর্তেই ঘরটি ভেঙে যায়। লোনাপানির স্রোতে ভেসে যান পরিবারের সদস্যরা। তিনি বলেন, ‘সেদিন আমি এক বন্ধুর সঙ্গে হাটহাজারীতে থাকায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাই। হয়তো আল্লাহর অশেষ রহমতেই আজও বেঁচে আছি। কিন্তু সেই রাতের স্মৃতি এখনও ভুলতে পারিনি। মনে পড়লেই শরীর কেঁপে ওঠে।’

গণ্ডামারা উপকূলের বাসিন্দা ফরিদুল আলম বলেন, ‘সেদিন রাতে নিষ্ঠুর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আমার গর্ভধারিণী মা, দাদি, ছোট দুই বোন ও চারজন চাচাতো বোনসহ পরিবারের আটজন সদস্যকে কেড়ে নিয়েছিল। একই বাড়ি থেকে প্রাণ হারিয়েছিলেন আরও ২৪ জন। আজও সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা মনে হলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না।’

ভয়াল ২৯ এপ্রিল শুধু শোকের দিন নয়, এটি সতর্কতারও প্রতীক। দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতনতা, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, টেকসই বেড়িবাঁধ এবং দ্রুত সতর্কবার্তার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে মনে করিয়ে দেয় এই দিনটি। উপকূলের মানুষের প্রত্যাশা— আর যেন কোনো পরিবারকে সেই রাতের মতো স্বজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াতে না হয়। নিরাপদ বেড়িবাঁধ, কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উপকূল সুরক্ষা নিশ্চিত হলেই হয়তো একদিন কমবে উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের আতঙ্ক।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট