
বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রশাসন কাঠামোর এক নীরব এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গ্রাম পুলিশ। ইউনিয়ন পরিষদভিত্তিক এই কর্মীরা তৃণমূল পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রথম সারির ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—দায়িত্বের পরিধি যেমন ক্রমাগত বিস্তৃত হয়েছে, তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক প্রাপ্য তেমন বাড়েনি। ফলে গ্রাম পুলিশের জীবনসংগ্রাম আজ কেবল ব্যক্তিগত দুঃখকথা নয়; এটি রাষ্ট্রের তৃণমূল নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক অমীমাংসিত সংকট।
তাদের বহুমাত্রিক দায়িত্ব, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। এ গ্রাম পুলিশের কাজকে অনেক সময় শুধুই পাহারাদারি হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে তাঁদের দায়িত্ব অনেক বিস্তৃত। গ্রামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সন্দেহজনক ঘটনার তথ্য থানা পুলিশকে জানানো, গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলে সহায়তা, মোবাইল কোর্ট ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে অংশগ্রহণ—এসবই তাঁদের নিত্যদিনের দায়িত্বের অংশ। নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা, ত্রাণ বিতরণে শৃঙ্খলা রক্ষা, বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উদ্ধার ও সতর্কতামূলক কার্যক্রমেও তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বাস্তবে তাঁদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টাই তাঁরা প্রস্তুত থাকেন। কোনো সংঘর্ষ, চুরি-ডাকাতি বা প্রশাসনিক নির্দেশ এলে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হতে হয়। অর্থাৎ, দায়িত্ব পালনে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন প্রায় এখানেই ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু এই নিরবচ্ছিন্ন কর্মব্যস্ততার বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ও আর্থিক নিরাপত্তা অত্যন্ত সীমিত।
বর্তমানে একজন দফাদার বা চৌকিদার যে মাসিক ভাতা পান, তা সরকার ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের যৌথ অর্থায়নে প্রদান করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় এই ভাতা গড়ে ৯ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বর্তমান বাজারদরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যয় বিবেচনায় এ পরিমাণ অর্থ একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণের জন্যও অপ্রতুল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিশ্চয়তার বিষয়টি। অনেক ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক সংকট বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ভাতা প্রদানে বিলম্ব ঘটে। ফলে মাসের পর মাস বকেয়া থেকে যায়। একজন নিম্নআয়ের কর্মীর জন্য এটি কেবল আর্থিক চাপ নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মানের প্রশ্নও। গ্রাম পুলিশরা সরকারি চাকরিজীবীদের মতো পূর্ণাঙ্গ বেতনস্কেল, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, চিকিৎসা ভাতা বা ঝুঁকি ভাতা পান না। অথচ তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো সংবেদনশীল বিষয়। ঝুঁকি রয়েছে, কিন্তু ঝুঁকির বিনিময়ে প্রাপ্য নেই—এই বৈপরীত্য দীর্ঘদিন ধরে চলমান।
স্থানীয় বিরোধ, রাজনৈতিক উত্তেজনা বা অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে প্রথম প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে গ্রাম পুলিশই এগিয়ে যান। অনেক সময় অপরাধী ধরতে গিয়ে বা সংঘর্ষে উপস্থিত থেকে তাঁরা শারীরিক ঝুঁকির মুখে পড়েন। কিন্তু তাঁদের হাতে পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম নেই। নেই স্বাস্থ্যবিমা বা দুর্ঘটনা বিমার নিশ্চয়তা। কোনো ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসা ব্যয় বহনের দায়িত্ব প্রায়ই তাঁদের ব্যক্তিগত সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে। এই বাস্তবতা একদিকে তাঁদের মনোবল ক্ষুণ্ন করে, অন্যদিকে দায়িত্ব পালনে অনিশ্চয়তার অনুভূতি তৈরি করে। অথচ তৃণমূল পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁদের ভূমিকা অপরিহার্য।
অধিকাংশ গ্রাম পুলিশ নিম্নআয়ের পরিবার থেকে আসা। সীমিত ভাতায় সংসার চালানো কঠিন হওয়ায় অনেকেই কৃষিকাজ বা অন্য শ্রমে যুক্ত হন। এতে তাঁদের মূল দায়িত্ব পালনে সময় ও মনোযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এটি গ্রামীণ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে তুলতে পারে। একজন গ্রাম পুলিশেরও পরিবার আছে, সন্তানের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন আছে। কিন্তু বর্তমান কাঠামোয় তাঁরা দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হতে পারছেন না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হয়েও তাঁরা সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছেন—এ এক গভীর বৈপরীত্য।
তৃণমূলের আইনশৃঙ্খলা শক্তিশালী করতে হলে গ্রাম পুলিশের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। প্রথমত, তাঁদের জন্য সম্মানজনক বেতনস্কেল ও নির্দিষ্ট গ্রেড নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ভাতা প্রদানে কেন্দ্রীয় তদারকি ও সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি ভাতা, চিকিৎসা সুবিধা ও দুর্ঘটনা বিমা চালু করা আবশ্যক। তৃতীয়ত, অবসরকালীন আর্থিক সুরক্ষা—যেমন পেনশন বা এককালীন অনুদান—প্রবর্তন করা দরকার। চতুর্থত, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম ও আইনি ক্ষমতার সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণের মাধ্যমে তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে। গ্রাম পুলিশকে কেবল সহায়ক কর্মী হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে তাঁদেরকে তৃণমূল নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঠামোগত অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে তাঁদের জীবনমান উন্নত হবে, অন্যদিকে গ্রামীণ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাও হবে অধিক কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক।
গ্রাম পুলিশের জীবনসংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কেবল নীতিমালায় নয়, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যাঁরা ২৪ ঘণ্টা জনগণের নিরাপত্তায় নিয়োজিত, তাঁদের নিজেদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। দায়িত্ব বাড়ছে, কিন্তু প্রাপ্য বাড়ছে না—এই অসামঞ্জস্য দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। সময় এসেছে বাস্তবসম্মত ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণের। গ্রাম পুলিশের প্রাপ্য মর্যাদা ও ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করলেই তৃণমূলের নিরাপত্তা কাঠামো সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হবে।
লেখক-
শিব্বির আহমেদ রানা
গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট
বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
ই-মেইল: shibbirahmedctg1990@gmail.com