শিব্বির আহমদ রানা::: শীতের আগমনী হাওয়ায় প্রকৃতি যখন নতুন সাজে সাজার কথা, তখন চট্টগ্রামের বাঁশখালী ইকোপার্কের চিত্র যেন উল্টো। একসময় স্বচ্ছ পানির লেক, সবুজ পাহাড় আর পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকা এ পর্যটন কেন্দ্রের বামেরছড়া ও ডানেরছড়া লেক এখন টোপাপানা ও জলজ ঘাসে প্রায় ঢেকে গেছে। এতে লেকের স্বাভাবিক সৌন্দর্য হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি হতাশ হচ্ছেন দর্শনার্থীরা। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পার্কটির পর্যটন আকর্ষণও ক্রমেই কমছে।
পার্কের বামেরছড়া লেকের পানির ওপর টোপাপানা ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ডানেরছড়া লেকের বিস্তীর্ণ অংশ ঢেকে গেছে জলজ ঘাস ও ভাসমান উদ্ভিদে। দূর থেকে দেখলে লেকের স্বচ্ছ পানির বদলে ঝোপঝাড়ে ভরা কোনো পরিত্যক্ত জলাশয় বলে মনে হয়। একসময় লেকের নির্মল পানি ও পাহাড়ের প্রতিবিম্ব দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করলেও বর্তমানে সেই সৌন্দর্য অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে।
শীত মৌসুমে এ পার্কে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি ও পরিযায়ী পাখির আগমন প্রকৃতিপ্রেমীদের বাড়তি আকর্ষণ জোগাত। কিন্তু লেকের ওপর জলজ উদ্ভিদের বিস্তার এবং দীর্ঘদিনের অযত্নে পাখির বিচরণও আগের মতো চোখে পড়ে না বলে স্থানীয়দের অভিমত। ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের আশায় পার্কে আসা অনেক দর্শনার্থী প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় হতাশ হয়ে ফিরছেন।
শুধু লেক নয়, পার্কের অন্যান্য অবকাঠামোর অবস্থাও নাজুক। বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে পড়েছে বা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। পাহাড়ে ওঠার সিঁড়ি, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, রিফ্রেশ কর্নার ও ছাতার মতো পর্যটকবান্ধব স্থাপনাগুলোর অনেকগুলোই ব্যবহারের অনুপযোগী কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ২০০৮ সালের পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কিছু অবকাঠামোর কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও উন্নয়ন না হওয়ায় পার্কটির সামগ্রিক পরিবেশে বিরাজ করছে অযত্নের ছাপ।
পার্কে যাতায়াতের সড়কেও রয়েছে ভোগান্তি। বাঁশখালী প্রধান সড়ক থেকে ইকোপার্ক পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে সাড়ে তিন কিলোমিটারের সংস্কারকাজ শেষ হলেও প্রবেশপথের কাছাকাছি ঝুঁকিপূর্ণ তক্তার সেতুটি এখনো সংস্কার করা হয়নি। সেখানে নতুন ও আধুনিক সেতু নির্মাণের প্রত্যাশা থাকলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় পর্যটকদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সেতুর কারণে দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের যানবাহন চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ বাঁশখালী ইকোপার্ক একসময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণকেন্দ্র ছিল। কিন্তু লেকের সৌন্দর্যহানি, জরাজীর্ণ স্থাপনা এবং যাতায়াতের সমস্যার কারণে পর্যটকদের আগমন কমছে। অন্যদিকে, বিশাল অংকের টাকার ইজারায় পার্ক পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া ইজারাদারদেরও লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
[caption id="attachment_6371" align="aligncenter" width="300"]
ডানেরছড়া লেক[/caption]
সংশ্লিষ্টদের মতে, লেক থেকে টোপাপানা ও অতিরিক্ত জলজ উদ্ভিদ অপসারণ, পানি ও পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা সংস্কার এবং প্রবেশপথের সেতু নির্মাণ জরুরি। পরিকল্পিত সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বাঁশখালী ইকোপার্কের হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পর্যটকদের আগ্রহও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
পার্কের ইজারাদার অ্যাডভোকেট আবুল মনছুর সিকদার বলেন, '২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভ্যাটসহ প্রায় ২২ লাখ টাকায় পার্কটি ইজারা নিয়ে আমরা বিপাকে পড়েছি। আগের মতো পার্কের জৌলুস নেই। লেক কচুরিপানা, জলজ ঘাস ও বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদে ছেয়ে গেছে। লেকের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ায় পর্যটকদের আগ্রহও কমে গেছে। পার্কে ভাসমান দোকান, পর্যটকদের জন্য বসার ও বিশ্রামের উপযোগী স্থান এবং লেকে পর্যটকবাহী নৌযান চালুর ব্যবস্থা করা গেলে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ বাড়ত। দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় পার্কটি দিন দিন তার চিরচেনা রূপ হারাচ্ছে। এত বড় অঙ্কের ইজারার বিপরীতে পার্কের দৃশ্যমান উন্নয়ন ও সংস্কার জরুরি।'
বাঁশখালী ইকোপার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইসরাইল হক বলেন, 'ইকোপার্কের স্বচ্ছ পানির লেক সবুজ জলজ ঘাস ও টোপাপানায় ঢেকে যাওয়ার বিষয়টি আমরা দেখেছি। এগুলো কীভাবে অপসারণ করা যায়, সে বিষয়ে উপজেলা কৃষি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ নিয়ে একটি সভাও হয়েছে। অন্যদিকে, পার্কের প্রবেশমুখের আগের ঝুঁকিপূর্ণ তক্তার সেতুটি আপাতত অস্থায়ীভাবে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেতুটির পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।'
প্রকাশক ও সম্পাদক : শিব্বির আহমদ রানা, ফোন নম্বর: ০১৭৮১৩-৭৭৮১৯, 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥: 𝐛𝐚𝐧𝐬𝐡𝐤𝐡𝐚𝐥𝐢𝐬𝐚𝐧𝐠𝐥𝐚𝐩@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦, অস্থায়ী ঠিকানা: স্মরণিকা প্রিন্টিং প্রেস। উপজেলা সদর, জলদী, বাঁশখালী, পৌরসভা, চট্টগ্রাম।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত