নিজস্ব প্রতিবেদক::: মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ–উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন। কারও কাছে তিনি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা, ‘কায়েদে আজম’; আবার কারও কাছে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের বিভাজনের প্রধান রাজনৈতিক কারিগর। বাংলাদেশে জিন্নাহকে নিয়ে প্রচলিত ধারণার বড় অংশই সীমাবদ্ধ ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৪৮ সালের ভাষা-বিতর্ককে ঘিরে। কিন্তু জিন্নাহর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, তাঁর চিন্তার বিবর্তন এবং মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে তাঁর দর্শন বুঝতে হলে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাকাতে হয়।
ব্যারিস্টার হিসেবে উত্থান: মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। কৈশোরে তিনি আইন পড়ার জন্য লন্ডনে যান এবং ১৮৯৫ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ইংল্যান্ডের বার-এ ডাক পান। দেশে ফিরে বোম্বেতে আইন পেশা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দক্ষ আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ১৯০০ সালে বোম্বের প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের পদে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগও পান। পরবর্তীতে মাসিক ১ হাজার ৫০০ রুপির সরকারি চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনি আইন পেশায় নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি বলেছিলেন–তিনি দিনে ১ হাজার ৫০০ রুপি আয় করার লক্ষ্য রাখছেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর ব্যক্তিগত পোশাক-পরিচ্ছদও ছিল অত্যন্ত অভিজাত; তাঁর দুই শতাধিক স্যুট ছিল এবং সেগুলোর অনেকগুলো লন্ডনের Savile Row-এর Henry Poole & Co. থেকে তৈরি করা হতো।
প্রথম জীবনের জিন্নাহ ছিলেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রবক্তা: আজকের জিন্নাহকে দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুর জিন্নাহকে বিচার করলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। তিনি শুরুতে ভারতীয় জাতীয় রাজনীতির মধ্যপন্থী ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে রাজনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত মনে করতেন। ১৯০৬ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন এবং পরবর্তী কয়েক বছর কংগ্রেসের রাজনীতির পাশাপাশি মুসলিম লীগের সঙ্গেও কাজ করেন। ১৯১৩ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগে যোগ দেন। অর্থাৎ জিন্নাহর রাজনৈতিক যাত্রার সূচনাতেই আলাদা মুসলিম রাষ্ট্রের দাবি ছিল–এমন ধারণা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার পরিবর্তন ঘটেছে দীর্ঘ সময় ধরে।
মুসলিম রাজনীতিতে কেন পরিবর্তন? জিন্নাহর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ধীরে ধীরে একটি প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে–ব্রিটিশ ভারতীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ও সংখ্যালঘু মুসলমানের রাজনৈতিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? এই প্রশ্ন থেকেই মুসলমানদের জন্য সাংবিধানিক নিরাপত্তা, পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবিতে তাঁর অবস্থান ক্রমশ শক্ত হয়।
১৯২৯ সালের ‘চৌদ্দ দফা’তে তিনি মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও সাংবিধানিক সুরক্ষার বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনীতি আরও স্পষ্টভাবে মুসলিম রাজনৈতিক জাতিসত্তার ধারণার দিকে অগ্রসর হয়। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পর মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক গতি পায়। তবে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, লাহোর প্রস্তাবের ভাষা সরাসরি আজকের পরিচিত ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক নকশা ছিল না; পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দাবিটি একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যায়।
জিন্নাহর মুসলিম দর্শন–ধর্মীয় পরিচয় নাকি রাজনৈতিক জাতিসত্তা? জিন্নাহর মুসলিম দর্শনকে শুধু ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করলে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে। তাঁর কাছে ভারতীয় মুসলমানরা কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় নয়; বরং তাদের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি, আইন ও রাজনৈতিক স্বার্থসম্পন্ন একটি পৃথক জাতিসত্তা। এই ধারণাই পরবর্তীকালে ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ নামে পরিচিত রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
তবে জিন্নাহর বক্তব্যে একই সঙ্গে একটি সাংবিধানিক ও নাগরিক রাষ্ট্রের ধারণাও দেখা যায়। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রচারিত এক বক্তব্যে তিনি পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংবিধানকে গণতান্ত্রিক ধরনের এবং ইসলামের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন; একই সঙ্গে পাকিস্তানকে ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র না করার কথাও বলেন।
অর্থাৎ জিন্নাহর রাজনৈতিক চিন্তায় ‘মুসলিম জাতিসত্তা’ ছিল রাষ্ট্র সৃষ্টির ভিত্তি, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্যে আইনের শাসন, গণতন্ত্র, সংখ্যালঘু অধিকার এবং নাগরিক সমতার কথাও গুরুত্বপূর্ণভাবে এসেছে। এ কারণেই জিন্নাহর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে।
উর্দু নিয়ে জিন্নাহর অবস্থান এবং বাঙালির সঙ্গে বিরোধ: জিন্নাহর সঙ্গে বাঙালির সবচেয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক বিরোধের একটি জায়গা ছিল ভাষা। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ভাষণে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। কয়েক দিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই ভাষানীতি পূর্ববাংলার বাঙালিদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
তবে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শুধু জিন্নাহ-বিরোধিতার ইতিহাস নয়; এর পেছনে ছিল পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার দাবি। পরবর্তীতে এই ভাষা-প্রশ্নই বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তা আরও শক্তিশালী হয়।
দেশভাগের পর জিন্নাহ: ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। জিন্নাহ পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল হন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত অভিজাত হলেও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ব্যক্তিগত পারিশ্রমিক নিয়ে সংযম দেখানোর কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সমকালীন বর্ণনায় পাওয়া যায়। একটি বহুল উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, তিনি গভর্নর জেনারেল হিসেবে মাসিক এক রুপি বেতন নির্ধারণ করেছিলেন। তবে এ তথ্য নিয়ে পরবর্তী সময়ে কিছু বিতর্কও রয়েছে, তাই এটিকে নিঃশর্ত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
জমিদারি বিলোপ–জিন্নাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক কতটুকু? দেশভাগের পর পূর্ববাংলায় জমিদারি বিলোপের বিষয়টিও অনেক সময় জিন্নাহর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে বলা হয়। কিন্তু ইতিহাসটি আরও জটিল। ব্রিটিশ আমল থেকেই বাংলায় জমিদারি বিলোপের দাবি জোরালো ছিল। ১৯৩৮ সালে গঠিত ফ্লাউড কমিশন ১৯৪০ সালে জমিদারি ও মধ্যস্বত্ব বিলোপের সুপারিশ করে। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের আইনসভা ‘East Bengal State Acquisition and Tenancy Act, 1950’ পাস করে এবং এর মাধ্যমে ধাপে ধাপে জমিদারি ও মধ্যস্বত্ব বিলোপ করা হয়। ফলে সাধারণ কৃষকের সঙ্গে সরকারের সরাসরি ভূমি-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়।
তাই বলা যায়, পূর্ববাংলার কৃষকের জমির অধিকার প্রতিষ্ঠায় ১৯৫০ সালের আইন ছিল একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক; কিন্তু এটিকে শুধু জিন্নাহর ব্যক্তিগত উদ্যোগের ফল বলা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরলীকরণ হবে।
তাহলে জিন্নাহ আসলে কে? জিন্নাহকে শুধু ‘দেশভাগের জন্য দায়ী নেতা’ অথবা শুধু ‘মুসলমানদের মুক্তির মহানায়ক’–এই দুই মেরুর যেকোনো একটিতে আটকে রাখলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন একজন সফল ব্যারিস্টার, ব্রিটিশ ভারতের সাংবিধানিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা, প্রথম জীবনে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সমর্থক এবং পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক জাতিসত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ।
তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও ক্ষমতার নিশ্চয়তা। সেই দাবিই সময়ের সঙ্গে পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে পরিণত হয়। আবার পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাঁর বক্তব্যে এমন একটি রাষ্ট্রের কথাও উঠে আসে যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ হবে। এই দ্বৈত মাত্রাই জিন্নাহকে ইতিহাসের একটি জটিল রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত করেছে।
১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর করাচিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি ভাষা ও কেন্দ্রীয়করণ প্রশ্নে পূর্ববাংলার সঙ্গে তাঁর বিরোধও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাঙালির সঙ্গে জিন্নাহর সম্পর্ক তাই একরৈখিক নয়–এটি একই সঙ্গে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, ভাষা-রাজনীতির ইতিহাস এবং পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশেরও ইতিহাস।
প্রকাশক ও সম্পাদক : শিব্বির আহমদ রানা, ফোন নম্বর: ০১৭৮১৩-৭৭৮১৯, 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥: 𝐛𝐚𝐧𝐬𝐡𝐤𝐡𝐚𝐥𝐢𝐬𝐚𝐧𝐠𝐥𝐚𝐩@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦, অস্থায়ী ঠিকানা: স্মরণিকা প্রিন্টিং প্রেস। উপজেলা সদর, জলদী, বাঁশখালী, পৌরসভা, চট্টগ্রাম।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত