সড়কে যানবাহনের হর্ন এখন শুধু সতর্ক সংকেত নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা নাগরিক জীবনের জন্য এক ধরনের শব্দ সন্ত্রাসে পরিণত হয়েছে। অটোরিকশা, সিএনজি, বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল–প্রায় সব ধরনের যানবাহনেই অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত শব্দের ব্যবহার চোখে পড়ে। যানজটে আটকে থেকেও একের পর এক হর্ন, সামনে গাড়ি থাকলেও হর্ন, মোড় পার হওয়ার সময় হর্ন, এমনকি হাসপাতাল-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশেও উচ্চস্বরে হর্ন–এ যেন সড়ক ব্যবস্থাপনার একটি স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু হর্নের এই লাগামহীন ব্যবহার মোটেই স্বাভাবিক নয়। এটি মানুষের শ্রবণ শক্তিতে, ঘুম, মানসিক প্রশান্তি ও হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, অতিরিক্ত পরিবেশগত শব্দের সঙ্গে ঘুমের ব্যাঘাত, স্ট্রেস, বিরক্তি, শ্রবণ সমস্যা, শিশুদের জ্ঞানীয় সক্ষমতায় প্রভাব এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। সড়ক পরিবহন অধিকাংশ শহর-নগরে শব্দদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস।
বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা অতিরিক্ত শব্দের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। শিশুদের পড়াশোনা ও মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে; ঘুমের মধ্যে বারবার শব্দে জেগে ওঠার ফলে পরদিন ক্লান্তি ও কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি শব্দদূষণ মানসিক চাপ বাড়াতে পারে এবং উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের মতো সমস্যার ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি–প্রয়োজনে হর্ন দেওয়া এবং অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো এক বিষয় নয়। দুর্ঘটনা এড়াতে বা অন্য চালককে তাৎক্ষণিক বিপদের বিষয়ে সতর্ক করতে হর্ন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু যানজট সরানোর জন্য, বিরক্তি প্রকাশ করতে, আগে যেতে চাপ সৃষ্টি করতে কিংবা নিজের উপস্থিতি জানান দিতে লাগাতার হর্ন বাজানো কোনোভাবেই দায়িত্বশীল চালকের পরিচয় নয়।
বাংলাদেশে এ বিষয়ে আইনও রয়েছে। সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারায় মোটরযানের শব্দমাত্রার সীমা নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে এবং নির্ধারিত সীমার বেশি শব্দ সৃষ্টি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নীরব এলাকায় মোটরযানের হর্ন বাজানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে। একই ধারায় অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্র বা হর্ন মোটরযানে স্থাপন বা ব্যবহারের বিরুদ্ধেও বিধান রয়েছে।
এমনকি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) হুটার, হাইড্রোলিক হর্ন ও অন্যান্য অননুমোদিত হর্ন ব্যবহার না করার বিষয়ে জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরও অতিরিক্ত মাত্রার হর্নের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে। অর্থাৎ সমস্যা সম্পর্কে রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান অস্পষ্ট নয়; মূল সংকট হচ্ছে নিয়মের কার্যকর প্রয়োগ ও ধারাবাহিক নজরদারিতে। উন্নত দেশগুলোর খবর নিলে দেখা যায়, তারা শব্দদূষণকে কেবল বিরক্তির বিষয় হিসেবে দেখে না; এটিকে জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। যতটুকু জেনেছি ইউরোপীয় ইউনিয়নে সড়ক, রেল ও বিমান চলাচলের শব্দদূষণ মূল্যায়ন, ‘হটস্পট’ চিহ্নিতকরণ এবং শব্দ কমানোর পরিকল্পনার ব্যবস্থা রয়েছে। ডাব্লিউএইচও-র নির্দেশনাও এসব নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সিঙ্গাপুরে নতুন ও চলমান যানবাহনের শব্দের নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে এবং যানবাহনের শব্দ নির্গমন নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দেশটির ড্রাইভিং নির্দেশনায়ও বলা হয়েছে, বিপদের সতর্কতা ছাড়া হর্ন ব্যবহার করা উচিত নয়; স্কুল বা হাসপাতালের মতো কিছু এলাকায় দুর্ঘটনা এড়ানো ছাড়া হর্ন ব্যবহার অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশেও তাই কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।প্রথমত, হর্নের শব্দমাত্রা পরিমাপের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু গাড়ির কাগজপত্র বা ফিটনেস পরীক্ষা করলেই হবে না; হর্ন ও অন্যান্য শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রের শব্দমাত্রাও পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাইড্রোলিক হর্ন ও অননুমোদিত উচ্চশব্দের হর্নের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বিআরটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন। তৃতীয়ত, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার আশপাশে ‘নীরব এলাকা’ বিধান কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব এলাকায় শুধু সাইনবোর্ড বসিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; নিয়ম ভাঙলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, চালকদের প্রশিক্ষণে ‘হর্ন ব্যবহারের শিষ্টাচার’ বাধ্যতামূলক করা উচিত। লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের সময় চালকদের বোঝাতে হবে–হর্ন চালকের অধিকার নয়, এটি প্রয়োজনের মুহূর্তে ব্যবহারের একটি সতর্ক সংকেত। পঞ্চমত, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও নীরব এলাকায় শব্দমাত্রা পরিমাপের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র স্থাপন করা যেতে পারে। অতিরিক্ত শব্দ শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট যানবাহন শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
সবচেয়ে বড় কথা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।বেপরোয়া গাড়ি চালানো, অযথা ওভারটেকিং, যানজট, অপরিকল্পিত স্টপেজ ও সড়কে বিশৃঙ্খলা–এসবও অতিরিক্ত হর্নের প্রবণতা বাড়ায়। তাই শুধু হর্ন নিষিদ্ধ করলেই হবে না; সড়কে শৃঙ্খলাও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় যদি এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে নগরায়ণ ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে শব্দদূষণের সমস্যাও আরও তীব্র হবে। এর অর্থ হবে আরও বেশি মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি। ডব্লিউএইচও-র হিসাবে শুধু পশ্চিম ইউরোপেই ২০১১ সালে যানবাহনজনিত শব্দদূষণের কারণে প্রায় ১০ লাখ স্বাস্থ্যকর জীবনবর্ষ হারানোর হিসাব পাওয়া গিয়েছিল।আমাদের সড়ক শুধু গাড়ি চলাচলের জায়গা নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার অংশ। একজন শিশু স্কুলে যাচ্ছে, একজন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, একজন বৃদ্ধ ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন কিংবা একজন কর্মজীবী মানুষ রাতে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন–তাঁদের সবারই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাই সময় এসেছে স্লোগান নয়, বাস্তব প্রয়োগের। প্রয়োজন ছাড়া হর্ন নয়–প্রয়োজনে সতর্ক সংকেত। শব্দের দাপট নয়–সড়কে শৃঙ্খলা। কারণ একটি সভ্য শহর শুধু উন্নত সড়ক, উড়ালসড়ক বা অসংখ্য যানবাহন দিয়ে তৈরি হয় না; একটি সভ্য শহরের পরিচয় হলো সেখানে মানুষ কতটা নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও শব্দদূষণমুক্ত পরিবেশে বসবাস করতে পারে।
হর্নের শব্দ কমানো তাই বিলাসিতা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষার জরুরি দায়িত্ব।
লেখক-
শিব্বির আহমেদ রানা
(লেখক ও কলামিস্ট)
বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
ই-মেইল: shibbirahmedctg1990@gmail.com
প্রকাশক ও সম্পাদক : শিব্বির আহমদ রানা, ফোন নম্বর: ০১৭৮১৩-৭৭৮১৯, 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥: 𝐛𝐚𝐧𝐬𝐡𝐤𝐡𝐚𝐥𝐢𝐬𝐚𝐧𝐠𝐥𝐚𝐩@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦, অস্থায়ী ঠিকানা: স্মরণিকা প্রিন্টিং প্রেস। উপজেলা সদর, জলদী, বাঁশখালী, পৌরসভা, চট্টগ্রাম।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত