নিজস্ব প্রতিবেদক::: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় কৃষিজমি, বসতঘর ও জীবিকা হারিয়ে বিপর্যস্ত মানুষের কাছ থেকে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে ক্ষুদ্রঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতারা অভিযোগ করেছেন, বন্যায় সবকিছু হারিয়েও কিস্তির চাপ থেকে মুক্তি মিলছে না। এমনকি চাল কেনার জন্য রাখা কিংবা ধার করে জোগাড় করা টাকাও কিস্তি হিসেবে আদায় করা হচ্ছে।
উপজেলার শীলকূপ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাব্বত আলী পাড়ার বাসিন্দা ছেনুয়ারা বেগম জানান, স্বামী আবু বক্করের চাষাবাদের জন্য তিনি গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। সঞ্চয়সহ প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার ৮৫০ টাকা কিস্তি পরিশোধের কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যায় পাহাড়ি ঢলে তাদের কৃষিজমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। সোমবার সকালে সাপ্তাহিক কিস্তি আদায়ে গ্রামীণ ব্যাংকের মাঠকর্মী নাছির উদ্দিন তাদের বাড়িতে যান। কিস্তির জন্য চাপ দিলে চাল কেনার উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করে রাখা এক হাজার টাকা তাকে দিতে বাধ্য হন তিনি। পরে বিষয়টি স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের নজরে এলে মাঠকর্মী ওই টাকা ফেরত দেন।
এ বিষয়ে মাঠকর্মী নাছির উদ্দিন বলেন, 'আমরা তো গ্রামীণ ব্যাংক। তিন মাস কিস্তি আদায় স্থগিত রাখার বিষয়ে আমাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।'
একই এলাকার আরও কয়েকজন গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা অভিযোগ করেন, বন্যায় কৃষিজমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী তিন মাস কিস্তি আদায় স্থগিত থাকার কথা থাকলেও মাঠকর্মীরা নিয়মিত বাড়িতে গিয়ে কিস্তি আদায়ের জন্য চাপ দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, একই গ্রামের রোজিনা বেগম জানান, সোসাইটি ফর ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভস (এসডিআই) থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি একটি অটোরিকশা কিনেছেন। স্বামী সেটি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রতি সপ্তাহে তাদের ২ হাজার ৬০০ টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। রোববার সারাদিন রিকশা চালিয়ে মাত্র ৪০০ টাকা আয় হয়। সোমবার সকালে কিস্তির টাকা জোগাড় করতে ধার-দেনা করে এক হাজার টাকা সংগ্রহ করলেও সংস্থার ক্রেডিট অফিসার তৌহিদ পুরো কিস্তি না থাকায় টাকা গ্রহণ করেননি এবং বাকি টাকা পরিশোধে চাপ দিতে থাকেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে এসডিআই বাঁশখালী শাখার ব্যবস্থাপক ইয়াছিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'আমরা জোর করে ঋণের টাকা আদায় করছি না। কেউ দিতে পারলে নিচ্ছি।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঋণগ্রহীতা বলেন, কৃষিজমি, অটোরিকশা ও বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন তারা। কিন্তু বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এখন কিস্তি পরিশোধে অক্ষম।সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠান কিস্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে ঋণ না দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা নাছির উদ্দিন বলেন, 'সরকার তিন মাসের জন্য কিস্তি আদায় স্থগিত করেছে। এনজিও ব্যুরোর চেয়ারম্যানও বিষয়টি প্রকাশ্যে বলেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও নির্দেশনা দিয়ে পোস্ট করেছেন। তারপরও কিস্তি আদায় চলছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।'
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গ্রামীণ ব্যাংক বাঁশখালী শাখার ব্যবস্থাপক অভিজিৎ চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন রোববার তার ভেরিফায়েড অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে জানান, বন্যাকবলিত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের কিস্তি আদায় ১৩ জুলাই থেকে পরবর্তী তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটলে এবং অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।
উল্লেখ্য, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) গত ১৩ জুলাই জারি করা সার্কুলার লেটার নং-৮৫–এ চট্টগ্রামসহ বন্যাকবলিত এলাকার সব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের কিস্তি আদায় তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখা, প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান এবং প্রয়োজনে দুর্যোগকালীন ঋণ দেওয়ার নির্দেশনা দেয়।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, স্মরণকালের ভয়াবহ এ বন্যায় বাঁশখালী উপজেলার প্রায় সাড়ে ১১ হাজার বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ বসতবাড়িতে পানি ঢুকে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ২০ কোটিরও বেশি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কয়েক হাজার কৃষক ফসল হারিয়ে এখনো চরম অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবি, দুর্যোগের এই সময়ে কিস্তি আদায়ে কঠোরতা নয়, প্রয়োজন মানবিকতা। কারণ মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে পারলেই একদিন ঋণও পরিশোধ করতে পারবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক : শিব্বির আহমদ রানা, ফোন নম্বর: ০১৭৮১৩-৭৭৮১৯, 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥: 𝐛𝐚𝐧𝐬𝐡𝐤𝐡𝐚𝐥𝐢𝐬𝐚𝐧𝐠𝐥𝐚𝐩@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦, অস্থায়ী ঠিকানা: স্মরণিকা প্রিন্টিং প্রেস। উপজেলা সদর, জলদী, বাঁশখালী, পৌরসভা, চট্টগ্রাম।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত