"অন্তত ৪ হাজার ঘর বিধ্বস্ত, ৮ হাজার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত; পাহাড়ি ঢল-জোয়ারে জনজীবন বিপর্যস্ত, বিদ্যুৎহীনতায় বাড়ছে দুর্ভোগ"
শিব্বির আহমদ রানা::: টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং সমুদ্রের জোয়ারে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কোথাও ঘরের চাল পর্যন্ত পানি, কোথাও আবার বসতভিটা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে অসহায় পরিবার। গ্রামে গ্রামে এখন শুধু দীর্ঘশ্বাস আর নীরব কান্না।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৪ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং সাড়ে ৮ হাজার ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে বহু বসতঘর, আঙিনা, গ্রামীণ সড়ক, হাট-বাজার, পুকুর ও নলকূপ হাঁটু থেকে কোমরসমান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সারাদিন বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ আরও কয়েকগুণ বেড়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নে বন্যার পানি এখনো বাড়ছে। নিম্নাঞ্চলের শত শত পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে উপজেলা প্রশাসন জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যেতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের মসজিদের মাইক ব্যবহার করে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং পানিবন্দি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. হোসাইন বলেন, 'কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে পুরো ইউনিয়ন কার্যত পানির নিচে। অসংখ্য কাঁচা ঘর ভেঙে গেছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি স্লুইসগেটে মাছ ধরার জাল বসিয়ে রাখায় পানি নামতে পারছে না। ফলে জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।' একই অভিযোগ গন্ডামারার চাষীদেরও। স্লুইসগেই বন্ধ করে তিনশতাধিক ফসলী জমি ডুবে গেছে।
চাম্বল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শহিদ উল্লাহ বলেন, 'ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ৮০০ পরিবার পানিবন্দি। প্রতিদিনই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।'
শীলকূপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ নুরী বলেন, 'আমার ইউনিয়নের প্রায় ৬শতাধিক পরিবার পানিবন্দি। ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়েও পানি ঢুকে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসে সাতটি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রাণসহায়তা নিয়ে বানবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বানও জানান তিনি।'
বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, বন্যা পরিস্থিতির অবনতির পর উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বৈলছড়ি এলাকা থেকে শিশুসহ ১৩ জন এবং ছনুয়া ও শেখেরখীল এলাকা থেকে আরও সাতজনকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, 'সরকারি বরাদ্দের ত্রাণসামগ্রী দুর্গত মানুষের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি মানবিক ডাকে সবাইকে সহযোগীতার হাত বাড়াতে আহ্বান জানান। ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ, বন্যাকবলিত এলাকা ও সার্বিক পরিস্থিতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।'
এদিকে পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে কৃষিজমি, মাছের ঘের ও পুকুর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় মোবাইল ফোন চার্জ, চিকিৎসাসেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাঁশখালীর বিভিন্ন গ্রামে এখন অসংখ্য দরিদ্র পরিবার খোলা আকাশের নিচে কিংবা আত্মীয়স্বজনের আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত পর্যাপ্ত ত্রাণ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ না নিলে মানবিক সংকট আরও গভীর হবে।
বন্যার ভয়াবহতায় বিপর্যস্ত এই জনপদের মানুষের পাশে সরকার, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং সমাজের বিত্তবানদের দ্রুত এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের ভাষায়, 'এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, একবেলা খাবার এবং একটু মানবিক সহায়তা।'
প্রকাশক ও সম্পাদক : শিব্বির আহমদ রানা, ফোন নম্বর: ০১৭৮১৩-৭৭৮১৯, 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥: 𝐛𝐚𝐧𝐬𝐡𝐤𝐡𝐚𝐥𝐢𝐬𝐚𝐧𝐠𝐥𝐚𝐩@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦, অস্থায়ী ঠিকানা: স্মরণিকা প্রিন্টিং প্রেস। উপজেলা সদর, জলদী, বাঁশখালী, পৌরসভা, চট্টগ্রাম।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত