শিব্বির আহমদ রানা::: ইতিহাস হচ্ছে একটি জাতির আত্মপরিচয়ের দর্পণ। যুগে যুগে মানুষের জীবন, প্রেম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের অসংখ্য অনুষঙ্গ ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে। আর লোকসাহিত্য সেই ইতিহাসেরই এক অনন্য ভাণ্ডার, যেখানে লিপিবদ্ধ না হলেও মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে সময়ের গল্প, সমাজের চিত্র এবং হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার উপকূলীয় সরল ইউনিয়ন এমনই এক ঐতিহাসিক জনপদ, যা বহন করে চলেছে বাংলার লোকসাহিত্যের এক অনন্য প্রেমগাঁথার স্মৃতি। এই জনপদের নাম উচ্চারিত হলেই ভেসে ওঠে মালেকা বানু ও মনু মিয়ার অমর প্রেমকাহিনী। শতাব্দী পেরিয়েও যে প্রেমগাথা আজও লোকমুখে, গান-গাথায়, যাত্রাপালায় এবং মানুষের আবেগে জীবন্ত।
লোকসাহিত্যের অমর উপাখ্যানঃ বাংলার লোকসাহিত্যে ‘মালেকা বানু-মনু মিয়ার প্রেম’ একটি সুপরিচিত ও ঐতিহাসিক উপাখ্যান। পূর্ব বাংলার গ্রামবাংলায় একসময় অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল এই গান– "মালেকা বানুর দেশেরে,বিয়ার বাইদ্য অলা বাজেরে/মালেকা বানুর সাতও ভাই, অভাগ্যা মনু মিয়ার কেহ নাই। মালেকা বানুর বিয়া হইবো, মনু মিয়ার সাথেরে.../" –এ গান কেবল একটি লোকগীতি নয়; এটি বহন করে একটি বাস্তব প্রেমকাহিনীর ইতিহাস। স্থানীয় জনশ্রুতি, লোকগাথা এবং প্রবীণদের বয়ানে জানা যায়, মালেকা বানু ও মনু মিয়ার প্রেম কোনো কাল্পনিক রূপকথা নয়; বরং এটি ছিল তৎকালীন সমাজবাস্তবতায় গড়ে ওঠা এক হৃদয়স্পর্শী প্রেমের ইতিহাস। সময়ের আবর্তে আধুনিকতার প্রবল স্রোতে অনেক লোকঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। তবুও গ্রামবাংলার প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও বেঁচে আছে মালেকা বানু ও মনু মিয়ার প্রেমগাথা, যা একসময় সারাদেশে যাত্রাপালা, মঞ্চনাটক এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু হয়েছিল।
ঐতিহাসিক প্রেমের নায়িকা মালেকা বানুঃ লোককাহিনীর নায়িকা মালেকা বানু চৌধুরীর জন্ম চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সরল ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। ইতিহাস ও জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন তৎকালীন প্রভাবশালী জমিদার ও সওদাগর আমির মোহাম্মদ চৌধুরীর একমাত্র কন্যা। সাত পুত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন পরিবারের আদরের একমাত্র দুলালী। অন্যদিকে, মনু মিয়া ছিলেন আনোয়ারা অঞ্চলের এক জমিদার পরিবারের সন্তান। জনশ্রুতি অনুসারে, জমিদারি তদারকির কাজে একসময় মনু মিয়া সরল গ্রামের সওদাগর বাড়িতে অবস্থানকালে প্রথম দেখাতেই মালেকা বানুর প্রেমে পড়েন। পরবর্তীতে কাজির মক্তবে অধ্যয়নরত মালেকা বানুর সঙ্গে তার পরিচয় গভীর সম্পর্কে রূপ নেয়। কিন্তু প্রেমের পথ ছিল সহজ নয়। নানা সামাজিক ও পারিবারিক টানাপোড়েন অতিক্রম করে অবশেষে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। স্থানীয়দের মতে, সে বিয়ে ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক। এক মাসব্যাপী চলেছিল বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিল্পীরা এসে সংগীত পরিবেশন করেছিলেন। প্রেমের এই কাহিনী ধীরে ধীরে লোকগাথায় পরিণত হয় এবং পরবর্তী সময়ে সমগ্র অঞ্চলে কিংবদন্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
মালেকা বানুর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক মসজিদঃ লোককাহিনীর সেই মালেকা বানুর স্মৃতিকে আজও ধারণ করে আছে বাঁশখালীর সরল ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘মালেকা বানু মসজিদ’। শতাব্দী প্রাচীন এই স্থাপনাটি বর্তমানে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদটি ঘিরে রয়েছে বহু স্মৃতি ও জনশ্রুতি। জানা যায়, মোগল শাসনামলের শেষ দিকে জমিদার আমির মোহাম্মদ চৌধুরী মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের উত্তর দেয়ালে স্থাপিত একটি ফলকে উল্লেখ রয়েছে, মালেকা বানু চৌধুরীর ছোট ভাইয়ের বংশধর মরহুম ফৌজুল কবির চৌধুরী ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো মসজিদটি সংস্কার করেন। পরবর্তীতে ২০১০ সালে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের উদ্যোগে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের লক্ষ্যে মসজিদটিতে পুনঃসংস্কার, টালি সংযোজন এবং স্মারক ফলক স্থাপন করা হয়। সর্বশেষ ২০২১ সালে মরহুম ফৌজুল কবির চৌধুরীর উত্তরসূরিরা মসজিদের মূল কাঠামো সংরক্ষণ করে একতলা বিশিষ্ট বর্ধিত অংশ নির্মাণ করেন।
বর্তমানে মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন মালেকা বানু চৌধুরীর বংশধররা।

হারিয়ে যাওয়া দীঘি, টিকে থাকা ইতিহাসঃ স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মসজিদের পাশে একসময় ছিল বিশালাকার একটি দিঘি, যা ‘মালেকা বানুর দিঘি’ নামে পরিচিত ছিল। বিস্তীর্ণ সেই দীঘি ছিল এলাকার অন্যতম দর্শনীয় স্থান। কিন্তু সময়ের নির্মম পরিক্রমায় দীঘিটির অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে দিঘির অধিকাংশ অংশ লবণচাষ ও মৎস্যঘের হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে ঐতিহাসিক এ নিদর্শনের মূল বৈশিষ্ট্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করে যদি এখানে একটি ঐতিহ্যভিত্তিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হয়, তাহলে মালেকা বানুর স্মৃতিকে আরও সমৃদ্ধভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে এটি দেশের ইতিহাস ও লোকঐতিহ্য চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও বিকশিত হতে পারে।
ইতিহাস সংরক্ষণে প্রয়োজন উদ্যোগঃ বাংলার লোকঐতিহ্য ও প্রেমকাহিনীর অনন্য নিদর্শন মালেকা বানুর মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস, লোকসাহিত্য এবং সামাজিক ঐতিহ্যের মূল্যবান স্মারক।
অথচ যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এ ধরনের অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন আজ বিলুপ্তির পথে। ইতিহাসবিদ, গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মতে, মালেকা বানুর মসজিদ ও সংশ্লিষ্ট প্রত্নঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের শেকড় ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে।
যেভাবে যাবেনঃ চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে বাঁশখালীগামী স্পেশাল বাস, এস আলম, সুপার সার্ভিস পরিবহনে করে বাঁশখালীর মিয়ার বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে হারুন বাজার সড়ক হয়ে সিএনজি অটোরিকশা বা মাইক্রোবাসযোগে সরল বাজারে পৌঁছে অল্প দূরত্ব অতিক্রম করলেই দেখা মিলবে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী—মালেকা বানুর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক মসজিদ ও কবরস্থানের।
প্রকাশক ও সম্পাদক : শিব্বির আহমদ রানা, ফোন নম্বর: ০১৭৮১৩-৭৭৮১৯, 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥: 𝐛𝐚𝐧𝐬𝐡𝐤𝐡𝐚𝐥𝐢𝐬𝐚𝐧𝐠𝐥𝐚𝐩@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦
অস্থায়ী ঠিকানা: স্মরণিকা প্রিন্টিং প্রেস। উপজেলা সদর, জলদী, বাঁশখালী, পৌরসভা, চট্টগ্রাম।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত