শিব্বির আহমদ রানা::: ক্যালেন্ডারের পাতায় বৈশাখের শেষ প্রহর। দুয়ারে কড়া নাড়ছে জ্যৈষ্ঠ—বাংলার বহুল প্রতীক্ষিত মধুমাস। এই সময়টিতে প্রকৃতি যেন রস-রঙে ভরে ওঠে; বাজারে নামে মৌসুমি ফলের বাহার। আর সেই তালিকার শীর্ষে থাকে রসালো, সুস্বাদু লিচু। আগাম লিচুর কথা উঠলেই সবার আগে যে নামটি উচ্চারিত হয়, তা হলো বাঁশখালীর কালীপুরের লিচু।
মধুমাস পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই চট্টগ্রামের বাঁশখালীর স্থানীয় বাজারগুলোতে লিচুর সরবরাহ বেড়েছে। তবে এ বছরের তীব্র দাবদাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরার প্রভাব পড়েছে ফলনের ওপর—কোথাও লিচুর আকার ছোট, আবার কোথাও ব্যতিক্রমও দেখা গেছে। তবু সামগ্রিকভাবে কালীপুর অঞ্চলে লিচুর ফলন আশাব্যঞ্জক। বৈশাখের শেষ দিকে বাজারে আসা আগাম লিচু কিছুটা অপরিপক্ব হলেও উচ্চ দামের আশায় বাগানিরা তা বাজারজাত করছেন। চাহিদা বেশি থাকায় তুলনামূলক উচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে এই লিচু।
বাঁশখালীর কালীপুর, সাধনপুর, বৈলছড়ি, জলদী, পুকুরিয়া, শীলকূপ ও চাম্বলসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বাগানগুলোতে এখন পাইকারদের আনাগোনা বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও বিদেশে রপ্তানির জন্যও লিচু সংগ্রহ করা হচ্ছে। ক্রেতাদের মতে, আকারে ছোট হলেও কালীপুরের লিচুর স্বাদ অতুলনীয় এবং তুলনামূলক নিরাপদ হওয়ায় দাম বেশি হলেও এর চাহিদা অটুট।

সরেজমিনে দেখা যায়, পুকুরিয়া থেকে বৈলছড়ি পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার পাহাড়ি এলাকায় সড়কের পাশে, বাড়ির আঙিনায়, এমনকি পাহাড়ি ঢালেও গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে লিচু। তাছাড়া পূর্বাঞ্চলের পুঁইছড়ি, নাপোড়া, চাম্বল ও জঙ্গল জলদী এলাকাতেও একই চিত্র। প্রকৃতির বুকে যেন লাল রঙের উৎসব। চলতি বছর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনায় আশাবাদী চাষি ও ব্যবসায়ীরা; শুধু বাঁশখালী থেকেই রেকর্ড পরিমাণ লিচু বাজারজাত হতে পারে বলে ধারণা তাদের।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, এ বছর প্রায় ৫৬৫ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে, যার বড় অংশ কালীপুরে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও উৎপাদন ভালো হয়েছে। স্থানীয় বাজারে পুরোদমে লিচু আসতে শুরু করেছে এবং বাণিজ্যিক লেনদেন চলছে জোরেশোরে। তবে কালবৈশাখী বা অকালবৃষ্টি না হলে চাষিরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কালীপুরের পূর্ব কোকদণ্ডীর বাগানি নাছির উদ্দিন বলেন, 'আমার পাঁচটি লিচুর বাগান আছে, যদিও নিজস্ব নয়—গালিয়ত হিসেবে নিয়েছি। এ বছর বাগানে প্রায় সাত লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকার লিচু বিক্রি করেছি। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে দ্বিগুণ লাভের আশা করছি।' তিনি আরও জানান, সম্প্রতি বাগানে হাতির উপদ্রব বেড়েছে, যা ফলের ক্ষতি করছে।
অন্যদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারের চড়া দামে তারা বিপাকে পড়ছেন।
পৌরসদরের মো. ছগির নামে এক ব্যবসায়ী জানান, ছোট সাইজের লিচু প্রতি শত ১৫০–২০০ টাকা, মাঝারি ৩০০–৩৫০ টাকা এবং বড় সাইজের লিচু ৪০০–৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর যে লিচু হাজারপ্রতি দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল, তা এবার আড়াই থেকে সাড়ে চার হাজার টাকায় উঠেছে পাইকারিতে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে এই ফল।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, 'অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর আম, কাঁঠাল ও লিচুর ভালো ফলন হয়েছে। এর মধ্যে কালীপুরের লিচু বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চাষিরা ভালো দাম পাবেন।'
উল্লেখ্য, বাঁশখালীর কালীপুরের লিচু বহুদিন ধরে সুনামের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজার দখল করে আসছে। শুধু দেশেই নয়, সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও এই লিচু রপ্তানি হয়। প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রিয়জনের জন্য এই লিচু নিয়ে যান কিংবা পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। স্বাদ, গুণগত মান ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে কালীপুরের লিচু তাই হয়ে উঠেছে এক অনন্য পরিচিতি।
জ্যৈষ্ঠের মধুমাসের আগমনী বার্তা নিয়ে বাজারে এসেছে কালীপুরের লিচু–রঙে-রসে ভরপুর এই ফল যেমন মন কাড়ছে, তেমনি আকাশছোঁয়া দাম ভাবিয়ে তুলছে ক্রেতাদের।

প্রকাশক ও সম্পাদক : শিব্বির আহমদ রানা, ফোন নম্বর: ০১৮১৩৯২২৪২৮, 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥: 𝐛𝐚𝐧𝐬𝐡𝐤𝐡𝐚𝐥𝐢𝐬𝐚𝐧𝐠𝐥𝐚𝐩@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦
অস্থায়ী ঠিকানা: স্মরণিকা প্রিন্টিং প্রেস। উপজেলা সদর, জলদী, বাঁশখালী, পৌরসভা, চট্টগ্রাম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত