শিব্বির আহমদ রানা:: সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেই কেটেছে জীবনের অধিকাংশ সময়। বয়সের ভার কাঁধে চেপেছে, তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই। কারণ ঘরে অপেক্ষা করে আছে স্ত্রী আর চার কন্যাসন্তানের মুখ। জীবনের সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করা সেই মানুষটির নাম মোহাম্মদ লেদু মিয়া (৬০)। পেশায় তিনি একজন জেলে। অন্যের ট্রলারে মাঝির অধীনে নায়ার কাজ করেন। সাগরে যেতে পারলেই সংসারে হাঁড়ি চড়ে, আর সাগর বন্ধ মানেই অভাবের অন্ধকার।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শীলকূপ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তবলী পাড়ার আজিজ আহমদ বাড়ির বাসিন্দা লেদু মিয়া যেন গ্রামবাংলার এক নিঃশব্দ সংগ্রামী চরিত্র। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি লড়ছেন দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব আর নিয়তির বিরুদ্ধে।
সংসারে নেই কোনো ছেলে সন্তান। চার মেয়েকেই বুকের ধন করে বড় করছেন তিনি। বড় মেয়ে ফারেসা আক্তার (২০) দীর্ঘদিন ধরে জটিল রোগে ভুগছেন। মেঝো মেয়ে তাসমিন আক্তার (১৮) জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। তৃতীয় মেয়ে মোশারফা আক্তার (১৬) চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থী। বাঁশখালী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী সে। ছোট মেয়ে মোস্তফা আক্তার (১৪) একই বিদ্যালয়ের কারিগরি ভোকেশনাল শাখার নবম শ্রেণিতে পড়ছে।
দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেও মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ হতে দেননি লেদু মিয়া। কিন্তু অভাব যেন প্রতিদিন আরও নির্মম হয়ে উঠছে। সংসারের হাল ধরার মতো আর কেউ নেই তার। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ তিনিই। ফলে প্রতিটি দিন তার কাছে এক নতুন সংগ্রামের নাম।
তিন যুগ আগে একই এলাকার মনোয়ারা বেগমকে বিয়ে করে সংসার শুরু করেছিলেন লেদু মিয়া। স্বপ্ন ছিল ছোট্ট একটি সুখের ঘর হবে। কিন্তু সেই ঘরও ছিল ভাঙাচোরা, মাটির দেয়ালে ঘেরা। ছাউনিতে টিন নয়, ছিল লবণ মাঠে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের তেরপাল। বহু বছর ধরে মানবেতর জীবনযাপন করলেও ঘর মেরামতের সামর্থ্য হয়নি তার।
এর মধ্যেই নেমে আসে নতুন বিপর্যয়।
গত শুক্রবার (৮ মে) রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় লেদু মিয়ার বসতঘর। আগুনে ছাই হয়ে যায় পাশাপাশি থাকা আরও সাতটি পরিবারের ঘরবাড়ি। সেদিন রাতে লেদু মিয়া স্থানীয় বাজারে ছিলেন। খবর পেয়ে ছুটে এসে দেখেন—যে ঘরে ফিরে মাথা গুঁজতেন, সেটি তখন শুধু ছাই আর ধোঁয়ার স্তূপ। সেই দৃশ্য যেন বাকরুদ্ধ করে দেয় তাকে।
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু লুকাতে পারেননি তিনি। কারণ আগুন শুধু তার ঘর পুড়ায়নি, পুড়িয়ে দিয়েছে বহু বছরের কষ্টে জমানো সামান্য স্বপ্নও। মেয়ের বিয়ের জন্য খেয়ে না খেয়ে যে অল্প স্বর্ণ আর কিছু নগদ টাকা জমিয়েছিলেন, তাও আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। অবশিষ্ট কিছুই নেই, বেঁচে আছেন প্রানে। এখন খোলা আকাশের নিচেই দিন কাটছে তাদের।
কথা হলে লেদু মিয়া বলেন, 'তিনবেলা খাবার জোগাড় করতেই যেখানে কষ্ট হয়, সেখানে নতুন করে ঘর বানানো আমার কাছে স্বপ্নের মতো। মেয়েদের পড়ালেখা কীভাবে চালাবো, সেটাই এখন বুঝতে পারছি না।' এসএসসি পরীক্ষার্থী মেয়ে মোশারফা আক্তার বর্তমানে পড়াশোনার সুবিধার্থে দূরে আত্মীয়ের বাসায় থেকে পরীক্ষা দিচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে ছোট বোনটিও। কিন্তু এই অনিশ্চয়তার মধ্যে কতদিন তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে শঙ্কায় পরিবারটি।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. রাশেদ নুরী বলেন,
'লেদু মিয়া এখন পুরোপুরি কর্মহীন। সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় তার কোনো আয় নেই। জেলেদের জন্য সরকারি বরাদ্দের যে চাল পেয়েছিলেন, সেটিও আগুনে পুড়ে গেছে। মেয়ের বিয়ের জন্য কষ্ট করে জমানো স্বর্ণ ও নগদ টাকাও আর নেই। তিনি এখন নিঃস্ব।' তিনি আরও বলেন, 'লেদু মিয়ার পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত। আমরা চাই, লেদু মিয়া আবার ঘুরে দাঁড়াক। ভাগ্যের কাছে হেরে যাওয়া মানুষগুলোকেও বাঁচার সুযোগ দিতে হবে।'
সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করা মানুষ লেদু মিয়া আজ লড়ছেন জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়ের বিরুদ্ধে। তার ঘর পুড়েছে, সহায়-সম্বল হারিয়েছে; কিন্তু এখনো বেঁচে আছে একটুখানি আশার আলো—হয়তো কেউ একজন এগিয়ে আসবে, আবারও দাঁড় করাবে তার ভেঙে পড়া জীবন। লেদুরা ভাগ্যের কাছে হেরে যায়। আমরা চাইলে লেদুর পরিবারের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসতে পারি। লেদুরাও বাঁচুক শান্তিতে, অবয় নিয়ে।

প্রকাশক ও সম্পাদক : শিব্বির আহমদ রানা, ফোন নম্বর: ০১৮১৩৯২২৪২৮, 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥: 𝐛𝐚𝐧𝐬𝐡𝐤𝐡𝐚𝐥𝐢𝐬𝐚𝐧𝐠𝐥𝐚𝐩@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦
অস্থায়ী ঠিকানা: স্মরণিকা প্রিন্টিং প্রেস। উপজেলা সদর, জলদী, বাঁশখালী, পৌরসভা, চট্টগ্রাম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত