২০০০ সাল। আমরা তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। একদিন হঠাৎ ইসলাম শিক্ষার ক্লাসে প্রবেশ করলেন ইয়াং, পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত এক সুদর্শন যুবক। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, চোখেমুখে প্রাণোচ্ছল হাসি, আর নিজের একাডেমিক জীবনে সেরা ছাত্র হওয়ার আত্মবিশ্বাস—প্রথম দিনেই তিনি আমাদের মন জয় করে নিলেন। দরদমাখা শব্দচয়ন আর প্রাঞ্জল ভাষায় পুরো ক্লাসকে বিমোহিত করেছিলেন তিনি। সেই শুরু—পরবর্তী দুই বছর আমরা তাঁকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি, আর ২০০৩ সালে এসএসসি দিয়ে বিদায় নেওয়ার সময় তাঁর স্নেহমাখা ছায়াও পেছনে ফেলে এসেছি।
তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী গুণাবলীর এক শিক্ষক। হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য আমাদের বারবার উৎসাহ দিতেন। শুধু পাঠদান নয়, চরিত্র গঠনেও ছিল তাঁর বিশেষ মনোযোগ। ছাত্রীদের জন্য কমন রুমে নামাজের আলাদা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং তাদের নামাজে উৎসাহিত করা ছিল তাঁর অন্যতম খেদমত। ছাত্রদের জন্য পাশের মসজিদে যোহরের নামাজে হাজিরা খাতা চালু করে উপস্থিতি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেন। ভালো ছাত্রদের আলাদাভাবে নামাজের প্রতি যত্নবান হতে বলতেন। সেই সময় যোহরের নামাজে শিক্ষক হিসেবে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন কেবল আজগর স্যার ও তিনি। প্রতিবাদী মনোভাব ছিল তাঁর আরেকটি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। হক কথা বলার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নির্ভীক। আত্মসম্মানবোধ ছিল আকাশসমান। এমপিওভুক্ত একটি হাইস্কুলে ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে সাদাসিধে জীবনযাপন সহজ ছিল না। অন্য অনেক শিক্ষক যেখানে প্রাইভেট বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তিনি ছিলেন সে সবের বাইরে—স্বচ্ছ, সৎ ও আত্মমর্যাদাশীল।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর ও আন্তরিক। স্কুল থেকে বিদায়ের পরও সাবেক ছাত্রদের মনে রাখতেন, খোঁজখবর নিতেন। মতাদর্শের মিল ও ভালো ছাত্র হওয়ার সুবাদে হয়তো অনেকের মতো আমিও তাঁর বিশেষ স্নেহ পেয়েছি।
জীবনের এক পর্যায়ে শুনেছি, তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য মাঝে মাঝে ভেঙে পড়ত। তখন তিনি কিছুটা অস্থির হয়ে যেতেন, বেশি কথা বলতেন বা রেগে যেতেন। তবুও কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খারাপ হয়নি। অন্যায়ের সামনে তিনি কখনো মাথা নত করেননি।
পবিত্র রমজান মাসের জুমাবারে তিনি চলে গেলেন তাঁর প্রভুর সান্নিধ্যে। তিনি আমাদের প্রিয় শিক্ষক, বাঁশখালী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়–এর হেড মাওলানা আরিফ মোহাম্মদ হাসান নূর স্যার।
পবিত্র কোরআনের বাণী মনে পড়ে—
“হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার রবের দিকে ফিরে যাও, তুমি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট এবং তিনি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।” (সূরা আল ফাজর ২৭–৩০)
আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন, জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
স্মৃতিচারণে
মিজানুর রহমান
এসএসসি ২০০৩ ব্যাচ
বাঁশখালী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।
প্রকাশক ও সম্পাদক : শিব্বির আহমদ রানা, ফোন নম্বর: ০১৮১৩৯২২৪২৮, 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥: 𝐛𝐚𝐧𝐬𝐡𝐤𝐡𝐚𝐥𝐢𝐬𝐚𝐧𝐠𝐥𝐚𝐩@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦
অস্থায়ী ঠিকানা: স্মরণিকা প্রিন্টিং প্রেস। উপজেলা সদর, জলদী, বাঁশখালী, পৌরসভা, চট্টগ্রাম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত