"বল বীর, বল উন্নত মম শির! শির নেহারি’ আমারি, নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির।" জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই অমোঘ আহ্বান যেন ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে এসে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে শরীফ ওসমান হাদির জীবনে। তিনি ছিলেন সেই বীর, যিনি মাথা নত করেননি কোনো স্বৈরাচারের সামনে, যিনি বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন নিপীড়িত মানুষের অব্যক্ত আর্তনাদ। আজ যখন তিনি রাজকীয় প্রস্থানে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে উঠেছেন, তখন এই পংক্তিই তার জীবনের সবচেয়ে যথার্থ পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন ক্ষণজন্মা এক তরুণ তুর্কি- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনিবার্য নাম। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সেখান থেকে ফ্যাসিবাদমুক্তির বৃহত্তর সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে হাদি ছিলেন ধারাবাহিক, স্পষ্টবাদী ও আপসহীন। যখন বাকস্বাধীনতা ছিল শিকলবন্দী, যখন ভয়ের সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত, তখন যে কণ্ঠস্বর স্তব্ধতার দেয়াল ভেঙে দিয়েছিল- তিনি শরীফ ওসমান হাদি। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তার প্রতিটি উচ্চারণ ছিল শাসকের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী। ভিনদেশীয় আগ্রাসানের বিরোদ্ধে স্ফুলিঙ্গ।
জুলাই বিপ্লব হাদিকে কেবল পরিচিত করেনি, বরং তাকে ইতিহাসের এক অনিবার্য চরিত্রে পরিণত করেছে। তিনি এই বিপ্লবের দর্শক ছিলেন না; ছিলেন অন্যতম রূপকার। রাজপথ যখন ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত, যখন বুলেট আর টিয়ারশেলের গন্ধে বাতাস ভারী, তখন হাদি দাঁড়িয়েছিলেন সামনের কাতারে- নির্ভীক, দৃঢ়, অটল হিমালয় হয়ে। তার নেতৃত্ব মানুষকে শুধু সাহস দেয়নি, একটি প্রজন্মকে শিখিয়েছে কীভাবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেও স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনতে হয়। দেশপ্রেম তার কাছে ছিল নিছক স্লোগান নয়; মানচিত্রের সম্মান ছিল নিজের জীবনের চেয়েও বড়। হাদির দেশগড়ার আন্দোলন আর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল সার্বভৌমত্ব। তিনি ছিলেন ভারতীয় আগ্রাসনবিরোধী এক অটল হিমালয়। প্রকাশ্যে, স্পষ্ট ভাষায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন- বাংলাদেশ কোনো করিডোর নয়, এটি একটি স্বাধীন ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র। এই আপসহীন অবস্থান তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে দিয়েছে। বিদেশি আধিপত্য কিংবা দেশীয় দাসত্ব, কোনোটির কাছেই তিনি মাথা নত করেননি। সত্যিকারের তরুণ তুর্কির মতোই তিনি প্রমাণ করেছেন, স্বাধীনতার প্রশ্নে কোনো সমঝোতা নেই।
ফ্যাসিবাদমুক্তির আন্দোলন শেষ হলেও হাদির কাছে সংগ্রাম শেষ হয়নি। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজপথের চেতনাকে রাষ্ট্রের নীতিতে রূপ দিতে হলে সংসদে যেতে হবে। তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে প্রার্থী হয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন-বিপ্লবী মানেই রাষ্ট্র পরিচালনার অযোগ্য নয়; বরং তারাই সবচেয়ে যোগ্য। কিন্তু শত্রুরা তাকে সেই পথে এগোতে দেয়নি। একটি বুলেটেই থামিয়ে দিতে চেয়েছে তার দেশগড়ার স্বপ্ন। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- বুলেট কোনো আদর্শকে হত্যা করতে পারে না।
শরীফ ওসমান হাদি দেখিয়ে গেছেন- কীভাবে দেশ গড়তে হয়, কীভাবে দেশকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হয়, আর কীভাবে মানুষের হৃদয় জয় করে নিতে হয়। তার জীবন ছিল নীতির এক জীবন্ত পাঠশালা। স্মরণে আসে, নিজ আসনে নির্বাচনী প্রচারণাকালে এক বাড়িওয়ালা ছাদ থেকে তার ওপর ময়লা পানি নিক্ষেপ করেছিল। হাদি তখন ক্ষুব্ধ হননি, প্রতিবাদে মুখর হননি; বরং মৃদু হাসিতে বলেছিলেন, “ময়লা ফেলেছেন তো আরও দিন। অন্তত আপনি শান্তি পাচ্ছেন। আপনার শান্তিতেই আমার তৃপ্তি।” এই একটি বাক্যই তার উদারতা, সহনশীলতা ও মানবিক উচ্চতার সাক্ষ্য বহন করে। তিনি চলাফেরা করতেন গ্রামের আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই। কখনো সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা, কখনো পাঞ্জাবির সঙ্গে লুঙ্গি- আড়ম্বরহীন জীবনযাপনেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন মানুষের কাছাকাছি থাকার ভাষা। তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হতো ফজরের সালাত শেষে। প্রথম কাজ ছিল মুসল্লিদের সঙ্গে কুশলবিনিময়, তাদের কথা শোনা, তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া। তিনি সুন্দরভাবে কথা বলতেন, শব্দচয়ন ছিল পরিমিত ও শালীন; আর প্রতিবাদের ভাষায় ছিল কাজী নজরুল ইসলামের মতোই অগ্নিগর্ভ স্পষ্টতা। হাদি প্রায়ই বলতেন, “মৃত্যু একদিন হবেই; তবে আমার মৃত্যু যেন হয় বিপ্লবের যাত্রাপথে।” নিয়তির নির্মম বাস্তবতায় সেই কথাই সত্য হয়ে উঠেছে। তার চলে যাওয়ার মধ্যে যেন ছিল অদ্ভুত এক তাড়া- যেন ইতিহাস তাকে অপেক্ষা করতে দেয়নি। আজ দেশজুড়ে তিনি ভালোবাসায় সিক্ত। এই তরুণ তুর্কি অজান্তেই হয়ে উঠেছেন অসংখ্য মানুষের পরমাত্মীয়। তার জীবন ও আত্মত্যাগ এ দেশের তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছে- আমরাও হাদি হবো, আমরাও দেশের জন্য বুক চিতিয়ে লড়ে যাবো।
হাদি তরুণ প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন এক অমূল্য পাথেয়। তিনি বলতেন, কেবল আবেগ দিয়ে দেশ গড়া যায় না। চাই জ্ঞান, মেধা ও নৈতিক দৃঢ়তা। নেতৃত্ব মানে পদ নয়; নেতৃত্ব মানে প্রতিকূল স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে পথ দেখানো। তার সেই বিখ্যাত উচ্চারণ- “আমরা মরে গেলে ইতিহাস হবো, আর বেঁচে থাকলে হবো কারিগর”। আজ রক্তাক্ষরে লেখা এক সত্য। সরল জীবনযাপন, মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর সীমাহীন সহনশীলতা ছিল তার চরিত্রের অলংকার।
নির্বাচনী প্রচারণাকালে ঢাকায় এক নৃশংস হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানেই ১৯ ডিসেম্বর'২৫ ইংরেজী তারিখে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দেশে আনা হয় তার মরদেহ। ২০ ডিসেম্বর দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হয় তার জানাজা। জানাজা জনতার ঢলে পরিণত হয় শোক। বিশ্ব দেখেছে একজন ক্ষণজন্মা বীরের প্রস্থান। বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিকের ইমামতিতে জানাজা শেষে তাকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে।
এ যেন ইতিহাসের এক গভীর প্রতীকী মুহূর্ত। বিদ্রোহী কবির পাশে শায়িত হলেন বিদ্রোহের বীর শরীফ ওসমান হাদি। যেন নজরুলের বাঁশরী আর রণতূর্যের উত্তরাধিকার হাদির বজ্রকণ্ঠে এসে পূর্ণতা পেল। ক্ষণজন্মা তরুণ তুর্কি শরীফ ওসমান হাদির রাজকীয় বিদায় আসলে একটি বিশাল দায়বদ্ধতার সূচনা। তিনি কেবল একজন বিপ্লবী নন- তিনি এক সাহসী দূরদর্শী ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক, এক স্বাধীনচেতা বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। বাংলার আকাশে-বাতাসে তার বজ্রধ্বনি সার্বভৌমত্বের গান হয়ে প্রতিধ্বনিত হবে বহুদিন। বিদায় হে বাংলার সিংহহৃদয় মহাবীর। নজরুলের পাশে আপনার প্রস্থান ইতিহাসের কাছে এক অমোঘ ঘোষণা- বীর কখনো মরে না, বীর চিরকাল বেঁচে থাকে।
শিব্বির আহমেদ রানা
গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট
ই-মেইল: shibbirahmedctg1990@gmail.com
প্রকাশক ও সম্পাদক : শিব্বির আহমদ রানা, ফোন নম্বর: ০১৮১৩৯২২৪২৮, 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥: 𝐛𝐚𝐧𝐬𝐡𝐤𝐡𝐚𝐥𝐢𝐬𝐚𝐧𝐠𝐥𝐚𝐩@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦
অস্থায়ী ঠিকানা: স্মরণিকা প্রিন্টিং প্রেস। উপজেলা সদর, জলদী, বাঁশখালী, পৌরসভা, চট্টগ্রাম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত